Advertisement
E-Paper

বাবা ভাঙলেও নেই মায়ের হেলদোল

বেশ কিছু দিন ধরেই দুগ্ধপোষ্য ছোট মেয়েকে খুনের মতলব ভাঁজছিল রামপ্রসাদ। কিন্তু ঠিক মতো সুযোগ পাচ্ছিল না। ৩১ ডিসেম্বর রাতে স্ত্রী চম্পা শিশুটিকে রেখে শৌচাগারে যেতেই সে গলা টিপে তাকে মেরে ফেলে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০১৬ ০১:২৭

বেশ কিছু দিন ধরেই দুগ্ধপোষ্য ছোট মেয়েকে খুনের মতলব ভাঁজছিল রামপ্রসাদ। কিন্তু ঠিক মতো সুযোগ পাচ্ছিল না। ৩১ ডিসেম্বর রাতে স্ত্রী চম্পা শিশুটিকে রেখে শৌচাগারে যেতেই সে গলা টিপে তাকে মেরে ফেলে। পুলিশের দাবি, টানা জেরার মুখে ভেঙে পড়ে বৃহস্পতিবার রাতে সে নিজেই এই কথা কবুল করেছে।

কিন্তু যার আচরণ নিয়ে পুলিশের ধন্দ কাটছে না, সে ওই শিশুর মা চম্পা। তিনি কেন খুনের কথা জেনেও চেপে গেলেন, শেয়ালে বাচ্চাকে মুখে করে নিয়ে গিয়েছে বলে জানালেন পড়শিদের, সে প্রশ্ন তো ছিলই। তাঁর নিরাসক্ত ভাবও শান্তিপুর থানার পুলিশকে অবাক করে দিয়েছে।

পুলিশের দাবি, চম্পার চোখ-মুখ আগাগোড়াই প্রায় স্বাভাবিক ছিল। শোকের চিহ্ন তেমন দেখা যায়নি। শিশুটির মৃতদেহ শনাক্ত করার সময়ে রামপ্রসাদকে কিছুটা বিধ্বস্ত মনে হলেও চম্পার চোখেমুখে কোনও ছাপ পড়েনি। শুধু তা-ই নয়। পুলিশের জেরার মুখে প্রথমে চম্পা নয়, ভেঙে পড়েছে রামপ্রসাদ। থানায় তিন দিনে তার ঘুম, খাওয়া-দাওয়া, ব্যবহারেও কোনও অস্বাভাবিকতা দেখেননি পুলিশকর্মীরা।

বুধবার শান্তিপুরে সাদোকিপাড়ায় ওই বাড়ির কাছেই পুকুরে শিশুর দেহ ভেসে ওঠার পরে রামপ্রসাদ, চম্পা ও শিশুর ঠাকুমা নীলিমা বিশ্বাসকে গ্রেফতার করা হয়। রানাঘাট আদালত সেই দিনই রামপ্রসাদ আর চম্পাকে পুলিশ হেফাজতে, নীলিমাকে জেল হাজতে পাঠিয়েছিল। এ দিন তাদের ফের আদালতে তোলা হলে তিন জনকেই ১৪ দিন জেল হাজতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নদিয়ার পুলিশ সুপার ভাস্কর মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘দ্বিতীয় বার কন্যাসন্তান হওয়ার কারণেই তাকে করেছে শিশুটির বাবা স্বীকার করে নিয়েছে। খুনের কিছুক্ষণের মধ্যেই মা এবং ঠাকুমাও গোটা বিষয়টি জানতে পারে বলেও আমরা জেনেছি।’’

বৃহস্পতিবার রাতে রামপ্রসাদকে সাদোকিপাড়ায় তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ঘটনার ‘পুনর্নির্মাণ’ করায় পুলিশ। তদন্তকারী অফিসারের দাবি, রামপ্রসাদ দেখিয়েছে কী ভাবে চম্পা শৌচাগারে যেতেই সে শিশুটিকে মেরে তার দেহ প্যান্টে জড়িয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। পাশের ঘরে তখন নীলিমা তাদের তিন বছরের বড় মেয়েকে নিয়ে টিভি দেখছিল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাছেই কলাবাগানে গিয়ে শিশুটির জামা খুলে ফেলে দেয় রামপ্রসাদ। সম্ভবত তার ধারণা হয়েছিল, এতে মৃত শিশুটিকে তাদের বাড়ির বাচ্চা বলে চেনা শক্ত হবে। এর পরে শ্মশানের রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে মাঠের ধারে পুকুরে সে ছোট্ট দেহটি ফেলে দেয়।

এ দিক-ও দিক ঘুরে মিনিট কুড়ি পড়ে রামপ্রসাদ বাড়ি ফিরতেই স্ত্রী আর মা তাকে চেপে ধরে। মেয়েকে খুন করেছে বলে রামপ্রসাদ তাদের কাছে কবুল করে। এর পরে তিন জন মিলেই শেয়ালে মুখে করে বাচ্চা তুলে নিয়ে যাওয়ার ‘গল্প’ বলতে থাকে পড়শিদের। জেলার এক পুলিশকর্তার বক্তব্য, শিশুটির ঠাকুমার আচরণের কারণ বোঝা সহজ। দ্বিতীয় মেয়ে হওয়ার পর থেকেই সে চম্পাকে নানা ভাবে গঞ্জনা দিচ্ছিল বলে প্রতিবেশীরা পুলিশকে জানিয়েছেন।

কিন্তু চম্পার ‘নিস্পৃহ’ আচরণের ব্যাখ্যা পাচ্ছে না পুলিশ। কেন সে সব জেনেও মিথ্যে গল্প বলতে রাজি হয়ে গেল? সে কি কেবলই স্বামী-সংসার বাঁচানোর চেষ্টা? না কি অন্য কিছু?

এ দেশে শিশুকন্যা হ্রাস নিয়ে গীতা আরভামুদান যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন তাতে অবশ্য দেখা যাচ্ছে, শিশুকন্যা হত্যায় দক্ষিণ ভারতে সঙ্গে পাল্লা দেয় পূর্ব ভারতের একটিই রাজ্য— পশ্চিমবঙ্গ। মূলত দক্ষিণবঙ্গে, এমনকী গ্রামীণ অবস্থাপন্ন পরিবারেও দু’য়ের বেশি মেয়ে হলেই তাদের জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। এর মধ্যে বহু ক্ষেত্রেই কন্যা নিধনে মায়েরা কোনও জোরালো আপত্তি তোলেন না। অথচ নিতান্ত গরিব-গুরবো পরিবারেও পাঁচ ছেলের ফের হলে পড়শিদের মিষ্টি খাওয়ানো হয়।

পুলিশ আপাতত দেখতে চাইছে, বিচারকের কাছে বয়ান দিতে গিয়েও রামপ্রসাদ-চম্পা একই কথা বলে কি না। জেলার এক পুলিশকর্তার কথায়, ‘‘বিচারকের কাছে শিশুটির বাবা-মায়ের গোপন জবানবন্দি দেওয়ানোর জন্য আমরা আবেদন করছি। সেখানে যদি অন্য রকম কিছু উঠে আসে, ফের দু’জনকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করব।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy