বাড়ির যে অংশটুকু জলের উপর মাথা তুলে রয়েছে, সেখানেই সারা রাত শোয়ানো বাবার দেহ। সকাল হতে চোখের জল চেপে ছেলে ফাইজুদ্দিন শেখ বাড়ির মহিলাদের মৃতদেহ আগলানোর দায়িত্ব দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন ডাঙার খোঁজে। প্রায় ২০ ঘণ্টা পরে সোমবার দুপুরে কবর দেওয়া হল নবগ্রাম থানার দেরুল গ্রামের উরফান শেখকে (৬০)।
টানা ১৫ দিন ধরে ব্রাহ্মণী, দ্বারকার নদীর জল ঢুকেছে মুর্শিদাবাদের এই গ্রামে। গোটা তল্লাট জলে ভাসছে। কোমর জল উরফান শেখের বাড়িতেও। ক’দিন ধরেই চিকিৎসা চলছিল উরফানের। কিন্তু গত ২ অগস্ট তিনি ফের অসুস্থ হয়ে পড়লে গ্রাম থেকে ১১ কিলোমিটার দূরের ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আর নিয়ে যেতে পারেনি পরিবার। রবিবার বিকেলেই তিনি মারা যান। এরপরেই দেখা দিল অন্য সমস্যা।
এলাকার বেশির ভাগ গোরস্থান জলের তলায়। আত্মীয়-প্রতিবেশীরা ফোন করে খোঁজখবর নিয়েও একটা নৌকার ব্যবস্থা করতে পারেননি। রাত নামতে কোমরজল ভেঙে কেউ বেরোতে সাহস করেননি। যেখানে সেখানে সাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে। লোডশেডিং। কে এমন ঝুঁকি নেবে?
সোমবার ভোর হতে না হতেই ফাইজুদ্দিন কয়েকজন প্রতিবেশীকে সঙ্গে নিয়ে ছুটলেন গ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে। ফাইজুদ্দিনের কথায়, ‘‘কোথাও হেঁটে, কোথাও সাঁতরে ডাঙার খোঁজ করেও পাচ্ছিলাম না।’’ সোমবার দুপুরের পরে গ্রামেরই একজন এসে খবর দেন যে, এক কিলোমিটার দূরে দেরুল প্রাথমিক বিদ্যালয়-লাগোয়া গোরস্থানটি একটু উঁচু জায়গায়। এখনও জলমগ্ন হয়নি।
কিন্তু মৃতদেহ কী ভাবে নিয়ে যাওয়া হবে? হাজার চেষ্টা করেও কোনও নৌকো না মেলায় ফাইজুদ্দিন ও জনাকয়েক প্রতিবেশী দেহ কাঁধে করে বুকজল ভেঙে রওনা দেন গোরস্থানের উদ্দেশে। ইতিমধ্যে বিষয়টি জানতে পেরে মুর্শিদাবাদ জেলার নবগ্রাম ব্লক প্রশাসন তড়িঘড়ি একটি স্পিড বোট পাঠায়। শেষের কিছুটা রাস্তা ওই বোটেই নিয়ে যাওয়া হয়। ফাইজুদ্দিনের কথায়, ‘‘গ্রামের মানুষ আমাদের পাশে না দাঁড়ালে কী যে হত ভাবতেই পারছি না।’’
উরফানের স্ত্রী উজেরা বেওয়া বলছেন, ‘‘অভাবের সংসারে সারাটা জীবন মানুষটা খেটে মরল। মরার পরেও ডাঙার জন্য এতটা কষ্ট পেতে হল।’’ হতাশা ঝরে পড়ে তাঁর গলা থেকে!
বন্যায় একই সমস্যায় পড়েছিলেন বসিরহাটের একটি গ্রামের বাসিন্দারাও। রবিবার দক্ষিণ আখড়াতলায় বেতনি নদীর ধারে একটি ইটভাটা সংলগ্ন মাঠে ফুটবল খেলার সময়ে বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ বাজ পড়ে মৃত্যু হয় অর্জুন সর্দার পাড়ার বাসিন্দা চার কিশোরের। তাদের নাম মিঠুন মুণ্ডা, শুভজিৎ সর্দার, অমিত সর্দার এবং নারায়ণ সর্দার। ওই গ্রামে নদীর ধারেই দাহ করা হয়। নদীর দু’ধার প্লাবিত হওয়ায় সৎকার হতে দেরি হয়। সারা দিনের শেষে সন্ধ্যায় শেষকৃত্য হয় চার কিশোরের।