কল্যাণী শহর থেকে কিছুটা দূরে কাঁঠালতলা। সুনসান এলাকা, গাছগাছালিও রয়েছে। তা বলে রাত সাড়ে আটটায় দুয়ার এঁটে পাড়া ঘুমিয়ে পড়েনি। কোনও বাড়ি থেকে আসছে টিভির আওয়াজ, রান্নার শব্দ। কোনও বাড়িতে স্কুলের পড়া তৈরি করছে কিশোরী। বৃহস্পতিবার সেই সময়ে দোকান থেকে মোটরবাইকে বাড়ি ফিরছিলেন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী শুভঙ্কর বিশ্বাস। সঙ্গে ছিলেন তাঁর বৃদ্ধ বাবা।
বাড়ির সামনে আসতেই তাঁদের ঘিরে ফেলে কয়েকজন দুষ্কৃতী, মারধর করে কেড়ে নেয় বাড়ির চাবি। তারপর যা যা ঘটেছে বলে শুভঙ্করবাবু জানিয়েছেন পুলিশকে, তা বলিউডের ছবিকেও হার মানায়। তাঁর দাবি, বছর পঁয়তাল্লিশের এক মহিলা নেতৃত্ব দিয়েছেন ওই হামলার। তাঁর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে তাঁর সঙ্গী জনা পনেরো যুবক। তাঁর বক্তব্য, ‘‘আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে ওরা আমাকে আর বাবাকে চুপ করিয়ে রাখে। আলমারি, বাক্স ভেঙে সারা ঘর তছনছ করে ওরা নগদ টাকা, দলিল, সোনা, উঠোনে রাখা গাড়ি ও মোটরবাইক নিয়ে চম্পট দিয়েছে।’’
কে ওই দুঃসাহসী মহিলা? শুভঙ্করবাবুর দাবি, তিনি ওই মহিলাকে চেনেন। ব্যবসা-সংক্রান্ত বিষয়ে মহিলার সঙ্গে তাঁর গোলমাল ছিল। সেটা মিটেও গিয়েছে। তারপরেও ওই মহিলা সঙ্গীদের নিয়ে এমন কাণ্ড ঘটালেন। পুলিশের কাছে ওই মহিলা-সহ বাকিদের বিরুদ্ধে অভিযোগও জানিয়েছেন শুভঙ্করবাবু।
পুলিশ অবশ্য শুভঙ্করবাবুর অভিযোগ নিলেও, রাত পর্যন্ত এই ঘটনাকে ‘ডাকাতি’ বলে মানতে চায়নি। কল্যাণীর এসডিপিও কৌস্তভকান্তি আচার্য জানান, বিষয়টি তিনি শুনেছেন। ঠিক কী ঘটেছে তা তদন্ত করে দেখে পদক্ষেপ করা হবে।
কেন পুলিশের এই সংশয়? কল্যাণী থানার পুলিশের দাবি, এটা দু’পক্ষের মধ্যে পাওনাগণ্ডা-সংক্রান্ত গোলমাল। যারা এসেছিল, তারা শুভঙ্করবাবুর কাছে অনেক টাকা পায়। তাই এই ঘটনাকে ঠিক ‘ডাকাতি’ বলা চলে না, বলছেন পুলিশের একাংশ। শুক্রবার দুপুরে কল্যাণী থানায় শুভঙ্করবাবু ও তাঁর পরিবারকে ডেকে পাঠানো হয়। তবে শুক্রবার রাত পর্যন্ত ওই হামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ধারা দেওয়া হবে, তা নিয়ে উচ্চবাচ্য করেনি পুলিশ।
যা দেখে স্থানীয় মানুষের প্রশ্ন, টাকা পাওনা থাকলেও, তা কি বাড়িতে চড়াও হয়ে লুঠপাট করে আদায় করা চলে? তাঁদের অভিযোগ, হামলাকারীরা প্রভাবশালী বলে পুলিশ বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইছে। এত বড় একটি বিষয়কে তারা দু’পক্ষের গণ্ডগোল বলে চালাতে চাইছে।
ঘটনার পরে আতঙ্কে আছেন শুভঙ্কবাবুর পড়শিরাও। তাঁদের একাংশের অনুমান, শুভঙ্করবাবুর বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় দুষ্কৃতীরা আগে থেকেই ওঁত পেতে বসেছিল। বৃহস্পতিবার রাতে স্কুলের পড়া তৈরির ফাঁকে বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিল সপ্তম শ্রেণির পড়ুয়া সুস্মিতা মণ্ডল। ঠিক সেই সময় শাসিয়ে উঠেছিল একটি মহিলা কন্ঠস্বর—‘অপারেশন শেষ না হওয়ার আগে একদম বাড়ির বাইরে বেরোবে না। বাড়ির অন্যদেরও বলে দাও। বাইরে বেরোলে কিংবা শুভঙ্করকে ফোন করলে সবক’টাকে শেষ করে দেব।’’
ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পরেও সিঁটিয়ে আছে বছর তেরোর ওই কিশোরী। কথা বলতে বলতে আচমকাই কেঁপে উঠছে ভয়ে। বলছে, ‘‘ওই মহিলার সঙ্গে অনেক লোক ছিল। আমি ভয় পেয়ে মা-কে ডাকি। তখনই ওরা মেরে ফেলার ভয় দেখায়। কিছুক্ষণ পরেই শুভঙ্করকাকুর মোটরবাইকের আওয়াজ আর চিৎকার শুনতে পাই।’’
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বেশ কয়েক বছর আগে ছোটখাটো চুরি কিংবা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও, কাঁঠালতলায় এমন দুষ্কৃতী হানার ঘটনা কোনও দিন ঘটেনি। এত বড় ঘটনার পরেও পুলিশের গড়িমসিতে আরও আতঙ্কিত তাঁরা।
বাজার ব্যবসায়ী সমিতি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কাঁঠালতলা বাজারে শুভঙ্করবাবুর রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের একটি দোকান রয়েছে। তাঁর সঙ্গে কল্যাণীর এক মহিলার (যাঁর নেতৃত্বে দুষ্কৃতীরা শুভঙ্করবাবুর বাড়িতে ওই কাণ্ড করেছে বলে অভিযোগ) ব্যবসা সংক্রান্ত লেনদেন ছিল। তা নিয়ে দু’জনের মধ্যে গোলমালও শুরু হয়। মাস কয়েক আগে ওই মহিলা স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির কাছে অভিযোগ জানান যে, শুভঙ্করবাবুর কাছে তাঁর কয়েক লক্ষ টাকা পাওনা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত সমিতি দু’পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসে।
কাঁঠালতলা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সহ সভাপতি নিতাই মজুমদার জানান, বাজারে শুভঙ্করবাবুর আরও একটি দোকান ছিল। ওই মহিলা সেই দোকানটি দাবি করেন। ঝামেলা মেটানোর জন্য শুভঙ্কর দোকানঘরটি ওই মহিলার নামে লিখে দেন। দু’জনেই আশ্বাস দেন, ভবিষ্যতে বিষয়টি নিয়ে আর কেউ কোনও ঝামেলা করবেন না। কিন্তু তারপরেও এই ঘটনা ঘটল কী করে, সে প্রশ্ন তুলছেন ব্যবসায়ীরাও।
স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়ে সদস্য তৃণমূলের সঞ্জীবন মণ্ডলও বলছেন, ‘‘ওঁদের দু’পক্ষের আলোচনায় আমিও ছিলাম। তখন ভেবেছিলাম, সমস্যা বোধহয় মিটে গেল। কিন্তু এমন ঘটনার পরে এলাকার নিরাপত্তা নিয়েই তো প্রশ্ন উঠে গেল।’’