ঝোল ফুটছে, গাড়িও ছুটছে— জ্বালানির নাম, ‘ডোমেস্টিক সিলিন্ডার’। চলতি ভাষায় রান্নার গ্যাস। তামাম মুর্শিদাবাদ জুড়ে ছোট গাড়ির জ্বালানি হিসেবে এটাই দস্তুর।
প্রশাসন জানে। পরিবহণ দফতরের ‘নজরে’ রয়েছে। পুলিশের কাছেও অজানা নয়। অজুহাত, নিতান্তই একটা অভিযোগের অভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।
ফলে, চার চাকার ছোট ভ্যান থেকে বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার ‘পুলকার’, এমনকী ছোট মাপের অ্যাম্বুল্যান্সও ছুটছে রান্নার গ্যাসে।
দিন কয়েক আগে বহরমপুর শহরে প্রসূতি নিয়ে হাসপাতালের পথে আচমকা থমকে গিয়েছিল ছোট অ্যাম্বুল্যন্সটা। গাড়ির চালক বলেন, ‘গ্যাস’ শেষ। রাস্তার ধারের চায়ের দোকান থেকে চটজলদি একটা ব্যবস্থাও অবশ্য করে ফেলেছিলেন তিনি। ফুটন্ত কেটলি নামিয়ে রেখে সিলিন্ডারটাই এগিয়ে দিয়েছিলেন দোকানি। ওই অ্যাম্বুল্যান্সে স্ত্রীকে নিয়ে যাচ্ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা স্বপন হালদার। নির্বিঘ্ন প্রসবের পরে মুচকি হেসে তিনি বলছেন, ‘‘ভাবছি ছেলের নাম রাখব সিলিন্ডার!’’
কিন্তু প্রান্তিক শহরগুলোর পাশাপাশি খোদ বহরমপুরে রান্নার গ্যাস এমন সহজলভ্য হয়ে উঠল কী করে? বহরমপুরে, ‘ইন্ডেন’, ‘ভারত গ্যাস’ এবং ‘হিন্দুস্থান পেট্রোলিয়াম’ বা এইচপি— তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থারও ডিলার রয়েছে। ১৪.২ কেজির সিলিন্ডার অঢেল বিলি করছে তারা?
ইন্ডেন ডিলার, ‘মুর্শিদাবাদ হোলসেল কনজিউমার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি’র চেয়ারম্যান সুকুমার অধিকারী বলছেন, ‘‘জেলায় আমরা ছাড়া অন্য যে সব সংস্থা থেকে ইন্ডেনের গ্যাস পাওয়া যায়, সেগুলি বেসরকারি। তারা কী করে তা বিলি করছেন বলতে পারব না।’’ নিজেদের এ ব্যাপারে ‘একশো ভাগ স্বচ্ছ’ বলে দাবি করেন তিনি। বেআইনি ব্যবহারের একটা সূত্র অবশ্য ধরিয়ে দিচ্ছেন—‘‘ভ্যানচালকদের একাংশ অনেক সময়ে খোলা বাজারে সিলিন্ডার বিক্রি করে থাকেন বলে শুনেছি। গাড়ির জ্বালানি হিসেবেও যা ব্যবহার হতেই পারে।’’ এইচপি-র বহরমপুরের ডিলার এ ব্যাপারে আরও অকপট। সংস্থার এক কর্তা আঙুল তুলেছেন ভ্যানচালকদের দিকেই। জানাচ্ছেন, তারা অনেক সময়েই রান্নার গ্যাস চড়া দামে খোলা বাজারে বিক্রি করছেন। গুদাম থেকেও সিলিন্ডার বেরিয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। তাঁর পাল্টা প্রশ্ন, ‘‘না হলে শহর জুড়ে গ্যাস-নির্ভর গাড়ির রমরমা কী করে?’’
শহর-জুড়ে রান্নাঘরে অবশ্য গ্যাসের হাহাকার। গোরাবাজার থেকে ইন্দ্রপ্রস্ত, সর্বত্র গৃহস্থের হা-হুতাশ। সেই ছবিটা উধাও শহরের রেঁস্তোরা, মিষ্টির দোকানে। নিয়মানুযায়ী রেস্তোরাঁ কিংবা দোকানে বাণিজ্যিক সিলিন্ডার ব্যবহারের কথা। অভিযোগ, অধিকাংশের রান্নাঘরে চলছে ডোমেস্টিক সিলিন্ডার। এ ব্যাপারে পুলিশ কিংবা জেলা প্রশাসন দেখিয়ে দিচ্ছে পরিবহণ দফতরকে। আর জেলা আঞ্চলিক পরিবহণ আধিকারিক চিরন্তন প্রামাণিক জানাচ্ছেন, বহরমপুরে গ্যাস রিফিলিং সেন্টার নেই। কোনও গাড়িতে ‘গ্যাস কিট’ (যা না থাকলে জ্বালানি হিসেবে সিলিন্ডার ব্যবহার করা যায় না) লাইসেন্স দেওয়া হয় না। আধিকারিক বলছেন, ‘‘ডিজেল-পেট্রলের লাইসেন্স নিয়ে গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’’
যা শুনে স্থানীয় এক পুল কার চালক হেসে জানাচ্ছেন, ‘‘ও সব আমাদের ‘ফিট’ করা আছে!’’ এক পুলিশ কর্তা জানাচ্ছেন, পরিবহণ দফতর অবশ্য অভিযান চালালেই হাতেনাতে গাড়ি ধরতে পারে। পরিবহণ আধিকারিক— ‘‘ব্যাপারটা আমাদের নজরে রয়েছে ঠিকই। তবে সাকুল্যে জনা চারেক ইন্সপেক্টর, কে তল্লাশি করবে?’’
তাই গাড়িও ছুটছে, ঝোলও ফুটছে— উৎস, রান্নার গ্যাস।