E-Paper

সংখ্যালঘু ভোট বাদ, আন্দোলনের ছায়ায় চিন্তা-আশার দোলাচল

ঘটনাটি ঘটেছিল কালিয়াচকে। সেখানকার ২ নম্বর ব্লকের বিডিও দফতরের সামনেই ঘটনা ঘটে। যা মোথাবাড়ি বিধানসভার অন্তর্গত।

বিপ্রর্ষি চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৩
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

‘‘মালদহের মোথাবাড়িতে যে ঘটনা ঘটেছে, যে করেছে, তাকে হাতেনাতে কে ধরেছে জানেন? আমাদের সিআইডি!’’

শব্দ ব্রহ্ম! কথা আর গুলি এক বার বেরিয়ে গেলে আর ফেরত নেওয়া যায় না। আপাতত এই বিষয়টি সব চেয়ে বেশি বোধগম্য হচ্ছে মালদহের তৃণমূল কংগ্রেস কর্মী-সমর্থকদের।

কালিয়াচক-২ বিডিও দফতরে তিন মহিলা-সহ সাত বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের দিনভর আটকে রেখে যে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছিল, সেই ঘটনায় বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার হন মোফাক্কেরুল ইসলাম। হরিরামপুরের সভা থেকে এই গ্রেফতারির কৃতিত্ব মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘তাঁর’ সিআইডি-কে দেন। সেই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে মিম, আইএসএফ-কে জড়িয়ে দূরত্ব বজায়েরও আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর এই ‘কৃতিত্ব’ নেওয়াই যেন মালদহে তৃণমূলকে বাড়তি চাপে ফেলে দিয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছিল কালিয়াচকে। সেখানকার ২ নম্বর ব্লকের বিডিও দফতরের সামনেই ঘটনা ঘটে। যা মোথাবাড়ি বিধানসভার অন্তর্গত। তার পাশেই কালিয়াচক-১ ব্লকের মধ্যে পড়ে সুজাপুর বিধানসভা কেন্দ্র। এই দুই কেন্দ্রেই মুসলিম সংখ্যাগুরু। গত বিধানসভা নির্বাচনে যে আসনগুলো থেকে সিংহভাগের থেকে বেশি ভোট তৃণমূলের ঝুলিতে গিয়েছিল। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনে সেই ভোট কমে দাঁড়ায় প্রায় তিন ভাগের এক ভাগে। ব্যাপক ভোট বৃদ্ধি হয় কংগ্রেসের। এই পরিসংখ্যানের উপরে দাঁড়িয়ে এই দুই আসনের ভাগ্য কোন দিকে যেতে পারে, তা নিয়ে চর্চা চলছে। তার উপরে যোগ হয়েছে এসআইআর-খাঁড়া। ব্যাপক হারে নাম বাদ গিয়েছে দুই কেন্দ্রেই। বিজেপির উপরে ‘ক্রোধে’র প্রতিফলনে সংখ্যালঘু ভোট ফের এক বার তৃণমূলের ঝুলি ভরতে পারে বলে আশায় ছিলেন জেলার তৃণমূল নেতারা। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী ওই ঘটনার সঙ্গে দলের দূরত্ব তৈরির চেষ্টার পরে সেই আশা খানিকটা ধাক্কা খেয়েছে বলেই মনে করছেন দলীয় নেতাদের একাংশ।

যে সব মানুষের নাম বাদ পড়েছে বা বিবেচনাধীনের তালিকায় আছে, সে দিনের প্রতিবাদী জমায়েতে মূলত তাঁরাই উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের। তীব্র মেরুকরণের মুখে তাঁরা জানাচ্ছেন, সেই জমায়েত ছিল নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের, যাঁদের তৃণমূল ছাড়া ‘বিকল্প’ ছিল না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের পরে তাঁদের বড় অংশের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে মালুম হচ্ছে এলাকা ঘুরে। তৃণমূল নেতাদের একাংশেরও বক্তব্য, অনেকে মনে করছেন, তৃণমূল এই আন্দোলন এবং আন্দোলনকারীদের বিপদে পাশে নেই। ফলে, বিজেপি-বিরোধিতার যে একচেটিয়া অংশীদারি তৃণমূলের ছিল, সেই ভাষ্য ধাক্কা খেয়েছে। লোকসভা ভোটের মতোই ভোট ভাগ হয়ে যেতে পারে।

জেলা তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, ‘‘গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভীতির পরিবেশ তৈরি হয়েছিল যে, এনআরসি হয়ে যাবে। বিজেপি এলে মুসলিমদের দেশছাড়া করবে। এ বার সেই ভয় নেই। দ্বিতীয়ত, মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের পরে তাঁরাও কিছুটা দ্বিধায়। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে গেল।’’ সাধারণ মানুষের আলোচনাতেও একটাই কথা, মুখ্যমন্ত্রীর ওই মন্তব্য তৃণমূলের সহজ কাজ কঠিন করে দিল। যদিও পরে একাধিক সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, প্রতিবাদের নামে হিংসা মর্থন করেন না। কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া মানুষের প্রতিবাদের পাশে আছে তাঁর দল। এনআইএ দিয়ে গ্রেফতারের নিন্দাও শোনা গিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর মুখে। শাসক দলের অন্য একাংশের মত, প্রাথমিক ভাবে পরিস্থিতি তৃণমূলের জন্য কঠিন হলেও ভোটের দিন পর্যন্ত তাতে বদলও আসতে পারে।

গত ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের নিরিখে মোথাবাড়ি থেকে এগিয়েছিল বিজেপি। তবে ২০২১ সালে বিধানসভায় জেতে তৃণমূল। আবার ২০২৪-এর লোকসভার নিরিখে এগিয়ে ছিল কংগ্রেস। এমতাবস্থায় এ বার এই কেন্দ্রের বিদায়ী বিধায়ক সাবিনা ইয়াসমিন চলে গিয়েছেন পাশের কেন্দ্র সুজাপুরে প্রার্থী হয়ে। আর তাঁর কেন্দ্র বদলও গুরুত্বপূর্ণ। এক ছোট ব্যবসায়ী তৃণমূলের জয় চেয়েও বলছেন, ‘‘আমাদের বিধায়ক অনেক কাজ করেছেন। কিন্তু দলের লোকেদের সঙ্গে ওঁর সম্পর্ক ভাল নয়। উনি প্রার্থী না-হওয়ায় তৃণমূল একটু পিছিয়ে পড়েছে।’’ বাজার করার ফাঁকে এক স্কুল শিক্ষকের মন্তব্য, ‘‘এই এলাকায় হিন্দু কম। তাই কারা বিজেপিকে ভোট দেবে, জানা আছে। কিন্তু তৃণমূল আর সেই ভোট পাবে না। এখানে কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপির মূল লড়াই হবে!’’ তবে পথচলতি এক ক্রেতার দাবি, ‘‘মানুষ এখন বুঝে ভোট দেয়। লোকসভায় রাহুল গান্ধীর ভোট, তাই কংগ্রেসকে দিয়েছে। বিধানসভা মমতার ভোট। তাই তৃণমূলকে দেবে।’’

সুজাপুর এক সময়ে পরিচিত ছিল বরকত গনিখান চৌধুরীর পরিবারের খাস তালুক হিসেবে। তবে সাবিনার কথায়, ‘‘আগেকার দিনে মানুষ এই সব ভেবে ভোট দিত। এখন মানুষ জানেন, কারা উন্নয়ন করবে। এখন প্রভাব এক জনেরই, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।’’ সাবিনার নির্বাচনী কার্যালয় সামলানো তৃণমূলের এক ঝাঁক নেতারও বক্তব্য, ‘‘সুজাপুরে যদি গনিই শুধু গুরুত্বপূর্ণ হতেন, তা হলে গত বার বিধানসভায় ইশা খান চৌধুরী জিততেপারলেন না কেন?’’

গ্রামের ভিতর ঢুকলেও বোঝা যায়, গনি-প্রভাব ম্লান। চায়ের দোকানে জটলায় ছিলেন সব বয়সের মানুষ। বললেন, ‘‘ইশা তো শুধু প্যাডে চিঠি লিখেই দায় এড়িয়ে যান। ওদের পরিবার দিয়ে আর ভোট হবে না।’’ তবে ভোট যে একতরফা তৃণমূলের পক্ষে যাবে, তা-ও মনে করছেন না তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, এ বারে খেলা ৫০-৫০। বিজেপি লড়াইয়ে নেই। কংগ্রেস আর তৃণমূলেরলড়াই হবে।

গনি-প্রভাব সুজাপুরে ফিকে হওয়ার কথা মেনে নিয়েও আত্মবিশ্বাসী কংগ্রেস প্রার্থী মহম্মদ আব্দুল হান্নান। তাঁর দাবি, ‘‘আমি ভূমিপুত্র। আমার বিধানসভার এক লক্ষ ৩৫ হাজার মানুষের নাম বিচারাধীন। তার মধ্যে হয়তো মেরেকেটে ৫০ হাজার মানুষ ভোটার তালিকায় ফিরে আসবেন। বাকিদের কী হবে? তৃণমূল পথ দেখাতে পেরেছে? যে মানুষ গত বিধানসভায় তৃণমূলকে ভোট দিয়েছিল, সেই মানুষের ভোট ফের কংগ্রেসে ফিরবে।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Sujapur minority vote

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy