দিনভর দফায় দফায় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। বন বাংলো বা রিসর্টের ঘরের টিনের চালের মন কেমন করা আওয়াজ। যত দূর চোখ যায় জলে ভেজা সবুজ চা বাগান বা শাল, সেগুন, শিরিষের ভেজা পাতা। ছোট্ট জলাশয়, খালবিলে ব্যাঙের ডাক। কোথাওবা স্যাঁতসেতে পাহাড়ি আঁকাবাকা পথ। ধান খেতের ঘাসের আলে গোড়ালি ভেজা জল। টুপটাপ বৃষ্টিতে লজ বা রিসর্টের বারান্দা বসে খিচুড়ি বা ইলিশ মাছের পদ। সব মিলিয়ে আগামী বর্যাকে পযর্টকদের কাছে উপভোগ্য করতে তৈরি হয়ে গিয়েছে, উত্তরবঙ্গের জঙ্গল, চা বাগানের ছোট ছোট জনপদ। বাদ যায়নি লাগোয়া সিকিমের পাহাড়ি কিছু গ্রামও। পোশাকি-নাম ‘মনসুন ট্যুরিজম।’’
শীত বা গরমের মরশুমের পযর্টন- পযর্টক মহলে পরিচিত নাম। এবার কেরল বা গোয়ার মত রাজ্যগুলিতে হু হু করে বেড়ে চলেছে অফ সিজনের নতুন এই পযর্টন মরসুম। সেই রাস্তা ধরেই উত্তরেও মনসুন পযর্টনকে নিজেদের মত করে বাড়তে উদ্যোগী হয়েছে বহু সংস্থাই। একে জঙ্গল বন্ধ, ধস বা বিপযর্য়ের আশঙ্কা থাকছে। সেখানে চা বাগান, জঙ্গল লাগোয়া বনবস্তি, খেতখামার, হেরিটেজ এলাকাগুলিকে নিয়ে নতুন করে এলাকার পযর্টন প্রসারের চেষ্টা বলেই জানাচ্ছেন পযর্টন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা জানান, বেসরকারি ক্ষেত্রে অনেকেই নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রয়োজন কিছু সরকারি প্রয়াসের। দরকার আরও ব্রান্ডিং আর প্যাকেজিং।
পযর্টন দফতরের উত্তরবঙ্গের যুগ্ম অধিকর্তা সুনীল অগ্রবাল বলেন, ‘‘মনসুনে সরকারি লজগুলিতে ১৫-২৫ শতাংশ বুকিং-এ ছাড় ঘোষণা করা হয়েছে। এখনও অবধি যা পরিস্থিতি তাতে বহু পযর্টন মনসুনে উত্তরবঙ্গে আসবেন। উত্তরবঙ্গের মনসুন সিজন নিয়ে পযর্টকদের আগ্রহ বাড়ায় আমরাও নানা চিন্তাভাবনা করছি। প্রচার, প্রসারের বিষয়টি এর মধ্যে অন্যতম।’’
প্রতি বছরের মার্চ মাস থেকে জুন মাস প্রথম অবধি সর্বত্র গরমের পযর্টন মরসুম চলে। ইতিমধ্যে শৈলশহর দার্জিলিং থেকে কালিম্পং, সিকিমের বিভিন্ন গন্তব্যে উপচে পড়ছে ভিড়। আগামী জুন অবধি বহু হোটেলেই রুম খালি না থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গিয়েছে। তার পরেই মনসুন। পর্যটন দফতরের এক শীর্ষ কর্তা জানিয়েছেন, এখনও রাজ্যের হিল স্টেশন, ফরেস্ট, ম্যানগ্রোভ, হিস্টোরিকাল, কালচার, ধর্মীয় স্থান ধরে ধরে বিভিন্ন ক্যাটাগরি তৈরি হয়েছে। সেই ভাবেই ব্রান্ডিং হয়েছে। মনসুন নতুন সংযোজন। বিষয়টি নিয়ে ভাবা শুরু হয়েছে।
প্যাসেফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনের (পাটা) ইন্ডাস্ট্রি কাউন্সিল সদস্য সম্রাট সান্যাল জানাচ্ছেন, উত্তরবঙ্গের মূল আকর্ষণ জঙ্গল ১৬ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর অবধি সরকারিভাবে বন্ধ থাকে। বর্যার জন্য পযর্টন ব্যবসায় ভাঁটা পড়ে। কিন্তু কেরল, গোয়ার মত রাজ্যকে দেখে পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে। ওঁরা সমুদ্র সৈকত, চা বাগান, ব্যাকওয়াটারের সঙ্গে বৃষ্টিকে মিলিয়ে নতুন নতুন প্যাকেজ তৈরি করেন। বিমান, হোটেল সংস্থার সঙ্গে আলাদা সস্তার রেট তৈরি হয়। শুধুমাত্র বৃষ্টি দেখতেই রাজ্যগুলিতে আরব থেকেই প্রতি বছর শ’য়ে শ’য়ে পযর্টক আসে। সেই জায়গায় আমাদের বর্যার জঙ্গল, চা বাগান বা পাহাড়ের কিছু কিছু অংশ আরও বেশি আকর্ষনীয়। কিন্তু আমাদের ব্র্যান্ডিং-এর সমস্যা রয়েছে। সেটাতে মেটাতে হবে।
সমস্যা মেটাতে কী করণীয় তা নিয়ে এবারই প্রথমবার অগস্ট মাসে বৌদ্ধদের ‘বর্ষাবাসে’র আদলে ‘চিন্তন শিবিরের আয়োজন করেছে অ্যাসোসিয়েশন ফর কনজারভেশন অ্যান্ড টুরিজ্যম (অ্যাক্ট)। দক্ষিণ সিকিমের পাহাড়ি জনপদ চেমচে’কে তিনদিনের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। সংগঠনের অন্যতম কর্তা রাজ বসু জানান, হিমাচল, তামিলনাড়ু ছাড়াও সিঙ্গাপুর থেকে উৎসাহীরা আসবেন। বুদ্ধিস্টরা বর্যার তিনমাসকে ‘বর্ষাবাস’ বলেন। সেই সময় সকলে বসে সারা বছরের বিভিন্ন তথ্যের আলোচনা, বর্যার সময় কী কী করণীয় তা ঠিক করেন। আমরা সেইভাবেই পযর্টনকে নিয়ে করব। তাতে বর্যার ঘোরা, নদীতে দেখা, খাবার, খানখেতে চারা রোপণ সবই থাকবে। আগে চিলাপাতা, সামসিং, বক্সা, কালচিনি বা জলপাড়ায় এই সময়টাকে তুলে ধরতে কিছু অনুষ্ঠান করা হয়েছে। পাহাড়কেও জোড়া হচ্ছে।
এই তুলে ধরার চেষ্টায় নেমেছেন ডুয়ার্সের পর্যটন ব্যবসায়ীরাও। গত দুইমাস ভোটের বাজারে অনেকটাই ব্যবসার টানের কথাও তাঁরা জানিয়েছেন। লাটাগুড়ি রিসর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক দীব্যেন্দু দেব জানান, বর্ষা নিয়ে এবার আমরা বিশেষ ভাবে ভাবছি। ভোটের জন্য দু’মাস খুব খারাপ গিয়েছে। তাই খাবারের উৎসব থেকে বুকিং-এ ছাড় সবই রাখা হচ্ছে বর্ষায়। বুকিং-এ সাড়াও মিলছে।