জমি মাত্র দেড় বিঘা। পাঁচজন শ্রমিক লাগিয়ে সেই জমির ধান কাটিয়েছিলেন কয়েকদিন আগেই। কিন্তু নোট বাতিলের গেরোয় হাতে খুচরো টাকা না থাকায় সেই শ্রমিকদের মজুরিটুকুও দিতে পারেননি। সেই মজুরির হাজার টাকা বকেয়া মেটাতে ও সংসারের খরচের জন্য মোট দু’হাজার টাকা তুলতেই লাইন দেন ষাটোর্ধ্ব নিতাই মণ্ডল। সঙ্গে নিয়ে যান ছোট ছেলে, নবম শ্রেণির পড়ুয়া রঞ্জিতকেও।
নালাগোলার বঙ্গীয় গ্রামীণ বিকাশ ব্যাঙ্কে লাইনটা ছিল অন্য দিনের মতোই সর্পিল, লম্বা। প্রায় তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পর ব্যাঙ্কের কাউন্টারের সামনে যখন পৌঁছন নিতাইবাবু, তখনই আচমকা লুটিয়ে পড়েন। ধরাধরি করে নালাগোলা হাসপাতালে নিয়ে গেলেও শেষরক্ষা আর হয়নি। সন্ধেতেই মারা যান তিনি। তাঁর ছেলে রঞ্জিতের কথায়, ‘‘বাবা ব্যাঙ্কের কাউন্টারের একেবারে কাছেই চলে গিয়েছিল। ব্যাঙ্কের টাকা তোলার স্লিপ লেখার সময়ই আচমকা পড়ে যায়।’’ নিতাইবাবুর ভাই ও প্রতিবেশীদের আক্ষেপ, ‘‘উনি যে টাকা তুলতে গিয়েছিলেন সেটুকুও তুলতে পারেননি। ওই পরিবারের এমনই আর্থিক পরিস্থিতি যে শেষ পর্যন্ত ধারদেনা করে শুক্রবার রাতেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে হয়েছে।’’
গাজোল ব্লকের চাকনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের শিশু পিড়ালুতোলা গ্রামে বাড়ি নিতাইবাবুর। বাড়িতে রয়েছেন স্ত্রী পুষ্পদেবী ও ছোট ছেলে রঞ্জিত। বড় ছেলে প্রসেনজিৎ বেঙ্গালুরুতে দিনমজুরের কাজ করেন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। দেড় বিঘে জমির ধান ধান বিক্রি করে ও বড় ছেলে বেঙ্গালুরু থেকে দিনমজুরি করে মাসে মাসে যে টাকা পাঠান তা দিয়েই কোনওরকমে সংসার চলে। কয়েকদিন আগেই পাঁচ জন শ্রমিককে লাগিয়ে ধান কাটান তিনি। কিন্তু খুচরো টাকা না থাকায় মজুরি দিতে পারেননি তিনি। বকেয়া মজুরির টাকা ও সংসার খরচের জন্য বড় ছেলের পাঠানো টাকা তুলতেই ব্যাঙ্কে গিয়েছিলেন তিনি।
নিতাইবাবুর ভাই গনেশ মণ্ডল বলেন, ‘‘দাদা বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ ছিল। মাস তিনেক আগে মালদহ মেডিক্যালে ভর্তিও করা হয়েছিল। কিন্তু এভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দাদা যে ব্যাঙ্কেই অসুস্থ হয়ে পড়বে ও পরে মারা যাবে তা আমরা ভাবতেই পারিনি।’’ ঘটনার সময় বাবার সঙ্গেই ছিল রঞ্জিত। এই ঘটনার পরে সেও দিশাহারা। তার কথায়, ‘‘পড়াশুনো কীভাবে চালাবো তা ভাবতেই পারছি না। অভাবের জন্য দাদা সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে শ্রমিকের কাজ করতে চলে গিয়েছে। আমাকে হয়তো সেই পথেই যেতে হবে।’’