উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির সামগ্রিক উন্নয়ন তদারকি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রশাসনিক সহযোগিতাকে আরও মজবুত করতে শিলিগুড়ির ‘উত্তরকন্যা’য় ম্যারাথন প্রশাসনিক বৈঠক করলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার উত্তরবঙ্গের শাখা সচিবালয় ‘উত্তরকন্যা’য় প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশিথ প্রামাণিক, পর্যটন মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ, দার্জিলিঙের সাংসদ রাজু বিস্তা এবং উত্তরবঙ্গের শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকেরা। বেশ কিছু আধিকারিক এই বৈঠকে ভার্চুয়ালিও যুক্ত ছিলেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, উত্তরবঙ্গের মানুষকে যাতে আর কলকাতার উপর নির্ভর করতে না হয়, সেই উদ্দেশ্যেই বাম জমানায় ‘উত্তরকন্যা’ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সমীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতর ছাড়া অন্য কোনও দফতরে পর্যাপ্ত আধিকারিক বা পরিষেবা নেই। এই অচলাবস্থা কাটাতে মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব এবং ডিভিশনাল কমিশনারদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে বেশ কিছু কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
প্রশাসনিক খতিয়ান তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, উত্তরবঙ্গের প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, জেলা পরিষদ ও পুরসভার জনপ্রতিনিধিরা অফিস না করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এবং একই হাল জিটিএতেও। এই প্রসঙ্গে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে শুভেন্দু বলেন, “সরকারের কোনও শনি-রবিবার নেই। সরকার মানে ২৪X৭। সরকারের কাজ কোনও ব্যক্তি, রাজনৈতিক লোক বা জনপ্রতিনিধির জন্য আটকে থাকা উচিত নয়। যাঁরা কাটমানির টাকা ফেরত দেওয়ার ভয়ে বা জনরোষের মুখে পড়ার আশঙ্কায় নিরুদ্দেশ হয়ে আছেন, তাঁরা হয় থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করুন, নয়তো পদত্যাগ করুন।” একই সঙ্গে কর্তব্যে গাফিলতি ও আধিকারিকদের সঙ্গে সহযোগিতা না করার অপরাধে ‘পলাতক’ পঞ্চায়েত প্রধান ও জেলা পরিষদের সদস্যদের অবিলম্বে শোকজ় করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ প্রয়াসে উত্তরবঙ্গের জন্য একগুচ্ছ উন্নয়নমূলক প্রকল্পের খতিয়ান পেশ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের বাজেট ১ হাজার কোটি থেকে বাড়িয়ে একধাক্কায় ২ হাজার কোটি টাকা করেছে। পাশাপাশি, জিটিএ-র বরাদ্দ ১৮০ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৩৬০ কোটি টাকা করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের জন্য একাধিক বড় প্রকল্পের ঘোষণা করে শুভেন্দু বলেন, “এই অঞ্চলে এইমস, ক্যানসার হাসপাতাল এবং কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার ও বালুরঘাটে নতুন মেডিক্যাল কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে হাসিমারা আর্মি এয়ারপোর্টকে কমার্শিয়াল করার জন্য অতিরিক্ত জমি দেওয়া হবে। বালুরঘাট ও মালদহ বিমানবন্দর চালু করার পাশাপাশি কোচবিহার এয়ারপোর্টের আরও আধুনিকীকরণ করা হবে। এ ছাড়া মালদহ, দক্ষিণ দিনাজপুর ও কোচবিহারে নতুন ইরিগেশন বা সেচ প্রকল্প নেওয়া হবে। পাশাপাশি, পর্যটন, বনভূমি রক্ষা এবং হর্টিকালচার ও ফুড প্রসেসিং শিল্পে বিশেষ জোর দেওয়া হবে।
বর্ষার মরসুমে উত্তরবঙ্গের বন্যা ও ধস পরিস্থিতির উপর বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে এই বৈঠকে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসের মেঘভাঙা বৃষ্টি ও হড়পা বানের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এ বার আগাম প্রস্তুতি সারা হয়েছে। মোট ৬৭০টি সেচ প্রকল্পের মধ্যে স্বল্পমেয়াদী ৩০০টি প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। বাকি দীর্ঘ মেয়াদী কাজগুলি শীতকালে করা হবে। পাহাড় ও তরাই-ডুয়ার্সের জন্য অতিরিক্ত ৪০০ জন পুলিশের একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল তৈরি রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া, দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সিভিল ডিফেন্সের যুবকদের ১৫ই জুন থেকে ১৫ই অক্টোবর পর্যন্ত দফায় দফায় কাজ দেওয়া হবে। পাশাপাশি, প্রাক্তন সৈনিকদের নিয়ে ৫০ জনের একটি বিশেষ প্রশিক্ষিত বাহিনী পাহাড়ে মোতায়েন থাকবে, যারা এনডিআরএফ, এসডিআরএফ ও পুলিশকে বিপর্যয় মোকাবিলায় সাহায্য করবে।
আরও পড়ুন:
উত্তরবঙ্গে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ১লা জুলাই থেকে রাজ্যে ‘১২৫ দিনের কাজ’ বা জিরামজি চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ২ কোটি ৫৬ লক্ষ জবকার্ড হোল্ডার কাজ পাবেন। এ ক্ষেত্রে দৈনিক মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে অদক্ষ শ্রমিকের ক্ষেত্রে ৩০০ টাকা, সেমি-স্কিলডদের জন্য ৪৫০ টাকা এবং স্কিলড শ্রমিকদের জন্য ৬০০ টাকা। এই কাজ অবিলম্বে শুরু করতে পঞ্চায়েত স্তরে ইঞ্জিনিয়ারিং সেল, গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান এবং গ্রাম সংসদের সভা ডেকে দ্রুত স্কিম তৈরি করতে বলা হয়েছে।
রাজ্যের ১ কোটি ১০ লক্ষের বেশি মহিলার অ্যাকাউন্টে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাঠানো নিয়ে পূর্বতন সরকারের আমলের কিছু ত্রুটি সংশোধন করা হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। জুন মাসে কিছু প্রযুক্তি ভুলের কারণে যারা ভাতার থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, তা শুধরে এ বার ১ কোটি ৯ লক্ষ ৯২ হাজার মহিলার অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পাঠানো হয়েছে। পোর্টাল আপলোডের ভুলের কারণে আটকে থাকা বাকি ২৬ হাজার উপভোক্তার সমস্যাও দ্রুত মিটে যাবে এবং আরও দু’মাস এই ফর্ম পূরণের কাজ চলবে। তবে এই ভাতার ক্ষেত্রে কিছু কঠোর নিয়ম বেঁধে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, কোনও অভারতীয় এই সুবিধা পাবেন না। যিনি তিনটি বিবাহ করেছেন, তিনি এই সুবিধা পাবেন না। যিনি সরকারের কোভিড বা অন্য কোনও জরুরি ভ্যাকসিন নেননি, তিনি বঞ্চিত হবেন। এমন কি সরকারি বিদ্যালয় ছেড়ে যাঁরা নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত, তাঁরাও এই ভাতা পাবেন না। কেবল প্রকৃত যোগ্য ও অভাবী মানুষেরাই এই সুবিধা পাবেন।
পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একনায়কতন্ত্রের সমালোচনা করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আগের মুখ্যমন্ত্রী সব নিজে সিদ্ধান্ত নিতেন। বাকিদের কাজ করতে দিতেন না।” তাঁর সংযোজন, “বর্তমান সরকারের মণ্ডল স্তর থেকে রাজ্য স্তর, বিধায়ক-সাংসদ থেকে মন্ত্রী— সবার কাজ নির্দিষ্ট করা আছে। বাম বা তৃণমূল জমানায় উত্তরবঙ্গ থেকে এত মন্ত্রী কখনও করা হয়নি। শুভেন্দুর দাবি, “বর্তমান সরকার উত্তরবঙ্গকে ১০ জন মন্ত্রী ও একাধিক ক্যাবিনেট মন্ত্রী দিয়েছে, যা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বকে প্রমাণ করে।” সব শেষে, বিধাননগরের আনারস মার্কেট ও প্রসেসিং সেন্টার পুনরায় খোলার বিষয়ে আড়তদারদের দাবির প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী জানান, স্থানীয় সাংসদ, বিধায়ক ও উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী সম্মিলিতভাবে এই বিষয়ে দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন এবং প্রশাসনিক কোনও জটিলতা হলেই কেবল তা মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে পাঠানো হবে।