দেশভাগের ফলে বদলে গিয়েছে মায়ের বেদীর স্থান। পুরাতন মালদহের মুচিয়া ও বাংলাদেশের ভোলাহাটের মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়েছে মহানন্দা নদী। দেশ ভাগ হলেও আজও ধূপের সুগন্ধ ও বাজনার সুর পৌঁছে যায় বাংলাদেশের ভোলাহাটে। সেই প্রাচীন রীতি মেনে আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পুরাতন মালদহের মুচিয়ার মহাদেবপুর চক্রবতীর বাড়িতে আরাধনা হয়ে আসছে চতুর্ভুজার। এখানে দেবী দুর্গা দশভুজা নয়, চতুর্ভুজা রূপে পূজিত হয়ে আসছেন প্রায় ৪০০ বছর ধরে। আর চক্রবর্তী বাড়ির পুজোকে ঘিরে আনন্দে মেতে উঠেছে পুরো মহাদেবপুর গ্রাম। চক্রবর্তী পরিবারের প্রবীণ সন্তোষবাবু বলেন, ‘‘ভোলাহাটে আমাদের পূর্বপুরুষ ফেলা চক্রবর্তী মায়ের পুজো শুরু করেন। ভোলাহাটের মায়ের বেদীর মাটি দিয়ে এখানে আমরা নতুন করে বেদী তৈরি করি। পূর্ব পুরুষদের নিয়ম মেনেই আমরা পুজো করে আসছি। বৈষ্ণব মতে আমাদের পুজো হয়। আমাদের পুজো শুধু বাড়িরই নয় এখন গ্রামবাসীদেরও হয়ে উঠেছে।’’
মালদহ-নালাগোলা রাজ্য সড়কের ধারে অবস্থিত পুরাতন মালদহের মুচিয়া গ্রামপঞ্চায়েতের মহাদেবপুর গ্রাম। এই গ্রামেই বসবাস করেন সন্তোষবাবু। গ্রামের প্রত্যেকেই সামিল হন পুজোতে। কারণ এখানে নিয়ম ও নিষ্ঠার সঙ্গে দেবীর আরাধনা করা হয়। রথযাত্রার দিন থেকে শুরু হয়ে যায় পুজো। ওই দিন শুরু হয় মুর্তি গড়ার কাজ। আর মহালয়ার দিন মায়ের চক্ষুদান করা হয়।
মহালয়ার দিন থেকে শুরু হয়ে যায় বাড়িতে চণ্ডীপাঠ। গ্রামের মানুষেরাও ভিড় জমাতে শুরু করেন চক্রবর্তী বাড়িতে। মায়ের মৃন্ময়ীরূপ ফুটে ওঠে। দেবী মূর্তির উচ্চতা চার ফুট। একচালাতেই থাকেন কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। ষষ্ঠীতে বোধন দিয়ে শুরু হয় পুজা। পঞ্চ বাজনা বাজিয়ে মহানন্দা নদীতে স্নান করানো হয় কলাবউকে। চক্রবর্তী বাড়ির সদস্যরা নিজেরাই সাত নদীর জল সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। অনেক সময় গ্রামবাসীরা তাঁদের এই কাজে সাহায্য করেন। চক্রবর্তীর বাড়ির দুর্গাপুজোকে ঘিরে জড়িয়ে রয়েছে নানা কাহিনি। গ্রামের অনেকে এখানে এসে প্রার্থনা করেন। গ্রামের দেড় শতাধিক পরিবার পুজোর ক’টা দিন বাড়িতে উনুন জ্বালান না। প্রত্যেকেই খাওয়া দেওয়া করেন চক্রবর্তী বাড়িতে। ওই বাড়ির প্রবীণ এক সদস্য ছায়াদেবী বলেন, ‘‘বাংলাদেশে আমাদের বাড়িতে এক শাঁখারু শাখা রাতেন। আমাদের বাড়ির মেয়ে পরিচয় দিয়ে জমিতে এক অপরূপা যুবতী দুই হাতে দুই জোড়া শাঁখা পরেন। আর দাম নিতে বলেন আমাদের পরিবারের কাছে। সেই থেকে আমরা মাকে দুই জোড়া করে শাঁখা পরাই। নিজে হাতে মায়ের পায়ে আলতা পরিয়ে দিই।’’
পুজো ক’টা দিন একেবারে হই হুল্লোড় করে কেটে যায় দিন। বির্সজনেও চক্রবর্তী বাড়ির পৃথক মাহাত্ম্য রয়েছে। বাংলাদেশে মাকে বির্সজন দেওয়া হত মহানন্দা নদীতে। সেই প্রথা মেনে আজও সেই মহানন্দা নদীতেই বির্সজন দেওয়া হয় চতুর্ভুজার। আর সেই বির্সজন দেখতেই নদীর দুই পাড়ে ভিড় জমান দুই বাংলার মানুষ। ওপারের মানুষও জানেন, এই পুজোর কথা।