শিলিগুড়ি জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তত ক্ষণে হুলুস্থুল পড়ে গিয়েছে। শুক্রবার বেলা সওয়া তিনটে। জরুরি বিভাগের ট্রলির উপর পড়ে রয়েছে লালু রায়ের নিথর দেহ। চিকিৎসক একটু আগেই তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেছেন। জখম মহিলা এবং পুরুষদের আনা হচ্ছিল জরুরি বিভাগে। কর্তব্যরত মহিলা চিকিৎসক তাঁদের দেখে দ্রুত ভর্তি করিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেন। সেই মতো তাদের দোতলায় শল্য বিভাগে নিয়ে যেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়।
সেনাবাহিনীর ট্রাক বেশ কয়েক জনকে চাপা দিয়েছে— এই খবর পাওয়ার পরই শিলিগুড়ি হাসপাতালে তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। তত ক্ষণে খবর পাওয়া গিয়েছে, জখমদের শিলিগু়ড়ি হাসপাতালেই আনা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে বাড়তি চিকিৎসকদের জরুরি বিভাগে ডেকে নেন হাসপাতালের সুপার অমিতাভ মণ্ডল। তিনি নিজেও অপারেশন থিয়েটারে কাজ ছেড়ে জরুরি বিভাগে চলে আসেন। পরে সুপার বলেন, ‘‘বড় দুর্ঘটনা শুনে চিকিৎসা ব্যবস্থা তৈরি রাখতে প্রস্তুত হতে বলি সকলকে। কিন্তু কত জন জখম প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না। শল্য চিকিৎসক, অর্থপোডিক, অ্যানাস্থেটিস্ট, চোখ, ইএনটি’র চিকিৎসকদেরও ডেকে আনি।’’
প্রাথমিক চি়কিৎসার পরে হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়, তিন জনের অবস্থা গুরুতর। এর মধ্যে রঘুবীর রায়কে মাটিগাড়ার এক বেসরকারি নার্সিংহোমে পাঠানো হয়েছে। অন্য দু’জন, অর্পিতা সরকার এবং রেণু প্রসাদকে অবশ্য শিলিগুড়ি হাসপাতালেই রাখা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, এখানে যা পরিকাঠামো আছে তাতে ওঁদের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
হাসপাতালে তখন জখমদের আত্মীয়দের হতভম্ব অবস্থা। রেণুর মা রাজকুমারী প্রসাদ বলছিলেন, ‘‘আমরা রিকশা ধরার জন্য দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ চার দিকে চিৎকার। কিছু বোঝার আগেই হুড়মুড় করে ঘাড়ের উপরে এসে পড়ল ট্রাকটা।’’ তিনি নিজে কোনওক্রমে বেঁচেছেন। কিন্তু রেণু পাঞ্জা লড়ছেন মৃত্যুর সঙ্গে।
চিকিৎসা চলছিল আর এক জখম মিন্টু মাহাতোর। তিনি যেন একটা জায়গাতেই আটকে গিয়েছেন। বারবার বলছিলেন, ‘‘গাড়িটা প্রথমে ধাক্কা দেয় এক মহিলাকে। তার পরে একটি রিকশাকে। তার পর অন্য দিকে চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখি আমার দিকে ধেয়ে আসছে। ছুটতে শুরু করেও ওর হাত থেকে বাঁচতে পারলাম না।’’
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে হাজির হন মেয়র অশোক ভট্টাচার্য। সঙ্গে ডেপুটি মেয়র এবং একাধিক মেয়র পারিষদ। আসেন পুরসভার বিরোধী দলনেতা নান্টু পাল ও তৃণমূল কাউন্সিলর রঞ্জন সরকারও। গুরুতর জখমদের উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনে হিমাঞ্চলবিহারের একটি নার্সিংহোমে পাঠানো যেতে পারে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেন মেয়র। হাসপাতালেই তিনি ঘোষণা করেন, ‘‘নার্সিংহোমে চিকিৎসার প্রয়োজনে ২ লক্ষ টাকা পুরসভার তরফেই দেওয়া হবে।’’ তবে এক জন বাদে বাকিদের এখনও হাসপাতাল থেকে সরানো হয়নি। জখমদের দেখতে যান পুলিশ কমিশনার চেলিং সিমিক লেপচা-ও।
ফেরি করে পুরনো বস্তা, প্যাকিং বাক্স কেনার কাজ করতেন লালু রায়। ঝঙ্কার মোড়ে রাজকুমার সাহুর দোকানে সেগুলি জমা দিতেন। রাজকুমারবাবু লালুবাবুর ভাই নিখিলবাবুকে দুর্ঘটনার খবর দেন। তাঁকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছন। জরুরি বিভাগে ঢুকে মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলেন নিখিলবাবু। বলেন, ‘‘সকালে একসঙ্গে কাজে বেরিয়ে ছিলাম। কী ভাবে যে কী ঘটে গেল! বাড়িতে ওর স্ত্রী, তিন ছেলে, দুই মেয়ে রয়েছে। কী করে যে বাড়িতে খবর দেব!’’ খবর পেয়ে কিছুক্ষণ পরেই অবশ্য পরিবারের অন্যরাও পৌঁছন হাসপাতালে।