রামঘাটে বৈদ্যুতিক চুল্লির সরকারি প্রকল্পকে ঘিরে আইন শৃঙ্খলার অবনতির জন্য পুলিশের একাংশই দায়ী। এমনই তথ্যই উঠে এল শিলিগুড়ি কমিশনারেটের বিভাগীয় তদন্ত রিপোর্টে। পুলিশ সূত্রের খবর, ওই তদন্ত রিপোর্টে বিশেষভাবে শিলিগুড়ি থানার প্রাক্তন আইসি বিকাশ দে’র কর্তব্যে গাফিলতিকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। রামঘাটে শিলান্যাসের অনুষ্ঠানকে ঘিরে বিশৃঙ্খলা ঠেকানো, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী গৌতম দেবের নিরাপত্তা এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যাত্রাপথে এলাকার নাগরিক মঞ্চের বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে প্রাক্তন আইসি সঠিকভাবে কোনও ব্যবস্থাই নিতে পারেননি বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এমনকি, তিনি শহরের পুলিশ কমিশনার, এডিসিপি-র মত উর্ধ্বতন কতৃর্পক্ষের নির্দেশও পুরোপুরি পালন করেননি বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রের খবর, গত ফেব্রুয়ারি মাসে বদলি হয়ে যাওয়ার আগে শহরের প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার জগমোহন ওই রিপোর্টটি উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা করেন। সম্প্রতি তা খতিয়ে দেখার পর বিকাশবাবুর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসাবে তাঁকে ‘সেন্সর’ ও করা হয়েছে। এতে অন্তত আগামী পাঁচ বছর তাঁর চাকরির সার্ভিস বুক, পদোন্নতি-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব পড়ার কথা।
এই প্রসঙ্গে শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা বলেন, ‘‘বিষয়টি একেবারেই আভ্যন্তরীণ বিভাগীয় বিষয়। আগের পুলিশ কমিশনারের আমলেই রামঘাটের ঘটনাগুলি ঘটেছিল। তবে এতটুকু বলতে পারি, কোনও অফিসার কর্তব্য ঠিকঠাক পালন না করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা তো নিতেই হবে।’’ কমিশনার এটাও বলেন, ‘‘দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার একেবারেই ঠিকঠাক ব্যবস্থা না-নেওয়ায় রামঘাটে সমস্যা হয়েছিল।
রামঘাটের ঘটনার কিছুদিন পর বিকাশবাবুকে শিলিগুড়ি থানা থেকে বদলি করে কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ি থানার আইসির দায়িত্ব দেওয়া হয়। শিলিগুড়ি থানার দায়িত্বে আসেন কালিম্পং থানার আইসি অচিন্ত্য গুপ্ত। এদিন তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে বিকাশবাবু সংক্ষিপ্ত জবাব, ‘‘আমার এ নিয়ে কিছুই জানা নেই। আমাকে তো কেউ কিছু জানায়নি। খোঁজ নিয়ে দেখব।’’
গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে রামঘাটে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের বিদ্যুতিক প্রকল্পকে ঘিরে গোলমাল শুরু হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর প্রকল্পের শিলান্যাস অনুষ্ঠানের দিন প্রকল্পের বিরোধিতা করে একদল বাসিন্দা বিক্ষোভ দেখান। এই সময় মহানন্দ মণ্ডল নামে এক বাসিন্দার সঙ্গে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রীর উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলাকালীন মন্ত্রী তাঁকে চড় মারেন বলে অভিযোগ। পাল্টা সরকারি কাজে বাধা এবং মন্ত্রীকে হেনস্থার অভিযোগ উঠে মহানন্দবাবুর বিরুদ্ধে। কমিশনারেটের তদন্ত রিপোর্টে (অর্ডার নম্বর-৪২০) বলা হয়েছে, পুলিশ কমিশনার এবং এডিসিপি এলাকায় আগাম গোলমালের আশঙ্কার কথা তৎকালীন আইসিকে জানিয়ে কড়া পুলিশি ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ দেন। কোনওভাবেই যাতে সরকারি অনুষ্ঠান বিঘ্ন না ঘটে তাও দেখতে বলা হয়।
রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তৎকালীন আইসি ঘটনার ব্যাপারে আগাম কিছুই আঁচ করতে পারেননি। গোলমাল বাড়তে থাকায় এসিডিপি ভোলানাথ পান্ডে ঘটনাস্থলে যান। সেই সময় অবরোধ, মিছিল ছাড়াও এলাকায় বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। কোনওক্রমে পরিস্থিতি সামলানো হয়। কিছুদিন পর আরেক দফায় এলাকায় পুলিশের উপর হামলার ঘটনা ঘটে। আইসি-র গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। বাসিন্দারা একজোট হয়ে নাগরিক মঞ্চ গড়েন। বিরোধী দলগুলি নাগরিক মঞ্চের পাশে দাঁড়ায়। নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়।
এরমধ্যে গত ২ ডিসেম্বর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিলিগুড়ি যান। তিনি বাঘাযতীন পার্কে অনুষ্ঠান করে জলপাইগুড়ি যান। মুখ্যমন্ত্রীর যাত্রাপথে জলপাইমোড়ে রামঘাটের নাগরিক মঞ্চের বিক্ষোভ চলছিল। তাই আইসিকে সতর্ক থাকতে বলা হয়। বিষয়টি নিয়ে কমিশনারেটের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (মেমো নম্বর-১২৩০/২৪-২০১৪) থেকেও ওসিকে সতর্ক করা হয়। তার পরেও প্রাক্তন আইসি ঠিকঠাক কোনও ব্যবস্থা নিতে পারেননি বলে অভিযোগ।
বৃহস্পতিবার বিকেলে রামঘাট এলাকায় দলের হয়ে প্রচার করেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী গৌতমবাবু। পুলিশের রিপোর্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘রিপোর্টটা পুলিশের নিজস্ব বিষয়। এটা নিয়ে কিছু বলব না। তবে কোনও এলাকার আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করার দায়িত্ব অফিসারদের কাজ। তা না হলেও সমস্যা তো বাড়বেই।’’