শিলিগুড়ির সাইবার ক্রাইম থানায় রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেন আইনজীবী রিঙ্কু চট্টোপাধ্যায় সিংহ। তাঁর অভিযোগ, কলকাতার ধর্মতলার ধর্না কর্মসূচিতে মমতা যে মন্তব্য করেছেন, তাতে দেশের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা ব্যবস্থা হতে পারে বিপন্ন। দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানতে পারে। পাশাপাশি, বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হতে পারে ওই মন্তব্যে। এই অভিযোগ এনে মমতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করেছেন ওই আইনজীবী। এর আগেও ওই আইনজীবী তথা শিলিগুড়ি বিজেপির কর্মী মমতার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেছিলেন।
রিঙ্কুর অভিযোগ, ধর্মতলায় মমতার মন্তব্য ‘প্ররোচনামূলক এবং সংবিধান বিরোধী’। দেশের সংবিধান, নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় সশস্ত্রবাহিনীর ‘ঐক্য, নিরপেক্ষতা, বিশ্বাসযোগ্যতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মমতা। ওই আইনজীবী এফআইআরে লিখেছেন, ‘‘জনগণ এবং সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি (মমতা) কেন্দ্রীয় সরকার এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিরুদ্ধে ওই অভিযোগ করেছেন বলে অভিযোগ। আন্তর্জাতিক মহলে কেন্দ্রীয় সরকারের ভাবমূর্তি এবং বিশ্বাসযোগ্যতাকে খাটো করার জন্য এবং দুই সার্বভৌম দেশের মধ্যে বৈরিতা তৈরি করার জন্য তিনি এ রকম করেছেন।’’ এফআইআরে এ-ও জানানো হয়েছে, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মমতা ওই মন্তব্য করলেও তাতে দেশের ‘সার্বভৌমত্ব, ঐক্য, আন্তর্জাতিক অবস্থান’ ধাক্কা খেতে পারে। মমতার ওই মন্তব্য সত্যি প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ করারও আবেদন জানিয়েছেন ওই আইনজীবী। তাঁর অভিযোগ, ওই মন্তব্যের কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে হিংসা ছড়াতে পারে। রিঙ্কুর কথায়, ‘‘রাজ্যের শীর্ষ আদালতে গিয়ে এই ঘটনার যাতে তড়িঘড়ি নিষ্পত্তি হয়, সেই চেষ্টাই করব। এটা দেশের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা ব্যবস্থার বিষয়৷ তার এই বক্তব্যের পরে বাংলাদেশে সংখ্যলঘুদের উপরে যে অত্যাচার হবে না, তার গ্যারান্টি নেই।’’
কী বলেছিলেন মমতা?
ওয়াই চ্যানেলে ধর্নায় বসে মমতা বলেছিলেন, ‘‘বাংলাদেশের একটা বড় খুনিকে এসটিএফ গ্রেফতার করেছিল, জেনে রাখুন। যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক রেগুলেশন হয়েছিল। অন্য দেশের কথা আমি বলছি না। আমার বলার অধিকার নেই।’’ তার পরেই তিনি বলেন, ‘‘কিন্তু আমি যেটা বলছি, সেই পয়েন্টটা হল, তার পরে তারা মেঘালয় হয়ে বাংলায় চলে আসে। বাংলায় যখন চলে আসে, তখন আমাদের এসটিএফ তাকে ধরে। এটা তাদের (এসটিএফ) ক্রেডিট। তার পরে হোম মিনিস্টার নিজে আমাকে ফোন করে বলছেন। এত দিন তো বলিনি। মুখ খুলিনি। এখন অত্যাচারের শেষ সীমায় গিয়েছে বলে... আমি নাম বলছি না ভদ্রতা করে। বাংলাদেশের লোক উত্তাল হয়ে যাবে। আমি সেটা চাই না। আমি দেশকে ভালবাসি।’’
সেই সময় অনেকেই ধর্নাস্থলে বসে সেই নাম প্রকাশ করার দাবি তোলেন। মমতা বলেন, ‘‘না বলব না দেশের স্বার্থে। (কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) কী বললেন? ‘আপনি বাংলার পুলিশকে বলে দিন, এই কথা যাতে বাইরে না বলে। এটা দেশের জন্য।’ কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? আজ সরকার বদলালেও মনে রাখবেন আমি তো সবটাই জানি। আমার হৃদয় কথা ভান্ডার, তথ্য ভান্ডার, সত্য ভান্ডার। সম্পদের ভয়ে কর্মীদের ভাসিয়ে দল ছেড়ে যাব না।’’
আরও পড়ুন:
মমতা কারও নাম না নিলেও মনে করা হচ্ছে, বাংলাদেশের বাংলাদেশের ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত ছিল তাঁর। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন ছিল। তার আগে, গত বছর ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় হাদিকে গুলি করা হয়। পরে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। সেই হত্যায় অভিযুক্তদের ভারতীয় পুলিশ গ্রেফতার করে। বনগাঁ থেকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফের হাতে তাঁরা ধরা পড়েছিলেন। ধৃতেরা হলেন ৩৭ বছরের ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং ৩৪ বছরের আলমগীর হোসেন। ফয়সাল পটুয়াখালি এবং আলমগীর ঢাকার বাসিন্দা। গত ৭ মার্চ গভীর রাতে বনগাঁর সীমান্ত এলাকা থেকে তাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। অভিযোগ, বনগাঁ হয়ে তাঁরা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টায় ছিলেন। এর পরেই বাংলাদেশে কেউ কেউ এই নিয়ে সরব হন। তবে সে দেশের তারেক রহমানের সরকার বা বিরোধী দলের তরফে এই নিয়ে কোনও মন্তব্য করা হয়নি।
এর আগে মমতার বিরুদ্ধে থানার দ্বারস্থ হয়েছেন শিলিগুড়ির বিজেপি কর্মী তথা পেশায় আইনজীবী রিঙ্কু। ২০২৫ সালে কলকাতায় রেড রোডে ইদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। রিঙ্কির অভিযোগ, সেই মঞ্চ থেকে হিন্দুত্ব এবং হিন্দুদের কটাক্ষ করেছিলেন তিনি। রাজ্যে পালা বদলের পরে ওই ঘটনা নিয়ে শিলিগুড়ি সাইবার থানায় রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন রিঙ্কি। সেই ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই আবার সাইবার থানায় মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন তিনি।