Advertisement
E-Paper

একসঙ্গে মাংস-ভাত খেলেন বিরোধীরা

দুপুরের পড়ন্ত রোদ্দুর। প্রায় আট ঘন্টা ভোটের শেষ। রানিডাঙার কালারাম হাইস্কুল লাগোয়া হাইওয়ের রাস্তার নিচে কাঁচা রাস্তা। মুখোমুখি দু’টি বড় মাপের প্যান্ডেল করে তৈরি কংগ্রেস, সিপিএমের বুথ অফিস। বিজেপির বুথ অবশ্য বড় রাস্তায় উপরে। চারদিকে পতাকা, ব্যানারে ছয়লাপ। ভিড়ে ঠাসা। এর মধ্যে একটিতে বড় প্লাস্টিকের টেবিলের উপর রাখা বড় গামলায় সাদা ভাত।

কৌশিক চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০১৫ ০২:৪৯
ফাঁসিদেওয়ায় একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ সারছেন সিপিএম ও কংগ্রেস কর্মীরা। ছবি: সন্দীপ পাল।

ফাঁসিদেওয়ায় একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ সারছেন সিপিএম ও কংগ্রেস কর্মীরা। ছবি: সন্দীপ পাল।

দুপুরের পড়ন্ত রোদ্দুর। প্রায় আট ঘন্টা ভোটের শেষ। রানিডাঙার কালারাম হাইস্কুল লাগোয়া হাইওয়ের রাস্তার নিচে কাঁচা রাস্তা। মুখোমুখি দু’টি বড় মাপের প্যান্ডেল করে তৈরি কংগ্রেস, সিপিএমের বুথ অফিস। বিজেপির বুথ অবশ্য বড় রাস্তায় উপরে। চারদিকে পতাকা, ব্যানারে ছয়লাপ। ভিড়ে ঠাসা। এর মধ্যে একটিতে বড় প্লাস্টিকের টেবিলের উপর রাখা বড় গামলায় সাদা ভাত। আরেকটিতে মুরগির মাংস। সাদা থার্মোকলের থালায় ভাত ও মাংস পরিবেশনে ব্যস্ত একদল যুবক।
দুই বুথেই চলছে খাবার সরবরাহ। মাটিতে, চেয়ারে বসে চটজলদি খেয়ে নিচ্ছেন সবাই। ফাঁকে ফাঁকে ভোটকেন্দ্রের বুথের লাইন, গ্রামের বাড়ি বাড়ি ভোটারদের হিসাবও। খাবারের ফাঁকেই কয়েকজনকে বলা শোনা গেল, ‘তৃণমূলের ছেলেদের দিকে নজর রাখ!’ ভিড়ের মধ্যে কে কংগ্রেস, কে সিপিএম, বোঝাই দায়। খাবার শেষের পর অবশ্য একে একে দ্রুত বুকের ব্যাজ ঠিক করে চলে যাচ্ছেন নিজের নিজের দলের বুথের দিকে। এর পরেই আওয়াজ শুরু, ‘লাইন ঠিক রাখতে হবে, বাইরের লোক আসবে না। নিজের ভোট সবাই দিন।’ শেষে কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের উদ্দেশে কয়েকজন বলে উঠলেন, ‘‘দাদা সন্ধ্যা হলেও ঠিকঠাক সব দেখতে হবে। গ্রামের লোক ভোট দিতে না পারলে কিন্তু মুশকিল।’’
এর মধ্যে হাজির আরেক দফার মাংস, ভাত। নিমেষের মধ্যে সেখানে বাইক ও লম্বা একটি গাড়ি নিয়ে হাজির জনা ১৫ যুবক। খাবারের থালা হাতে নেওয়ার ফাঁকে জানিয়ে দিলেন, মহমম্দবক্সের দিকে সব ঠিকঠাক রয়েছে। শাসক দলের ক্যাম্পও ফাঁকা। কথাবার্তায় বোঝা গেল, কোনও একদলের নয়, সিপিএম, কংগ্রেস এবং নির্দলদের সমর্থনেই কাজ করছেন ওই যুবকেরা। খাবার নিয়ে প্রশ্ন করায় অবশ্য প্রথম খানিকটা মুখ চাওয়াচাওয়ি শুরু। তার পরে কয়েকজন বললেন, ‘‘আরে দাদা একই হোটেলে অর্ডার ছিল তো। ওঁরাই বাসনপত্রের অভাবে এক জায়গায় খাবার দিয়ে গিয়েছে। তাই মিলেমিশে খেলাম আর কী!’’
তৃণমূলকে রুখতে একযোগেই যে লড়াইটা হবে, তার আঁচটা ফাঁসিদেওয়ায় কিন্তু সকাল থেকে মিলছিল। মহম্মদবক্স, রূপনদিঘি, রাবভিটা, জালাস, রাধাজোত, লিউসিপুখুরি, ঘোষপুকুর, চটহাট, নিকরগছ, বিধাননগরের কিছু অংশে ভোর থেকে শাসক বিরোধীদের এককাট্টা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি রাস্তার ধার ধরে পরপর একাধিক জায়গায় ক্যাম্প অফিস চালু হয়ে যায়। কংগ্রেস, সিপিএম, বিজেপি, কেপিপি, নির্দলদের এক সঙ্গে দেখা মেলে। ভোর থেকে সকালের চা, বিস্কুট আবার দুপুরের খাবারও একযোগে চলেছে বহু জায়গায়। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন গ্রামের থেকে বার হওয়ার রাস্তার মুখে চেয়ার পেতে বসতে দেখা যায় বিরোধীদের। গোলপোস্টের মতো বাঁশ গেড়ে পরপর টাঙিয়ে দেওয়া হয় লাল, সুবজ, সাদা, গেরুয়া সব পতাকাই। তাই সন্ধ্যায় সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অশোক ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘গণতন্ত্র বাঁচাতে গ্রামের মানুষ একজোট হয়ে অনেকটা সামজিক বয়কট করেছিল তৃণমূলকে।’’

সকাল থেকে রাত অবধি গোটা ব্লকের বিভিন্ন এলাকায় চষে বেড়ান কংগ্রেসের ব্লকের পর্যবেক্ষক তথা প্রদেশ কংগ্রেসের সম্পাদক সুবীন ভৌমিক বা জেলার সাধারণ সম্পাদক সুজয় ঘটকেরা। দুপুরে থেকে শাসক দলের তরফে ‘রামধনু জোটের’ বাড়বাড়ন্ত-সহ নানা অভিযোগ তোলাও শুরু হয়। তা শুনে কংগ্রেস নেতা সুজয়বাবু বলেন, ‘‘গণতন্ত্রহরণের চেষ্টা, একাধিক দুর্নীতির যে উপহার তৃণমূল শিলিগুড়িকে দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ জোটবদ্ধ হয়েছেন।’’ আর সুবীনবাবুর কথায়, ‘‘আমরাই তো একটি বুথে পুনর্নির্বাচন চেয়েছি। তৃণমূলই তো বাইরের থেকে লোক এনেছিল, তাই গ্রামের মানুষ একসঙ্গে এসব আটকেছেন।’’

সাত সকালেই অবশ্য কী হতে চলছে, তা টের পেয়ে যান তৃণমূলের ব্লকের পর্যবেক্ষক তথা জেলার নেতা অলোক চক্রবর্তী, দীপক শীলেরা। তড়িঘড়ি হাসপাতাল লাগোয়া ব্লকের পার্টি অফিসে খোলা হয় ‘ওয়াররুম’। কর্মীদের বিস্কুট, ঝুরিভাজা ঠান্ডা পানীয় খাইয়ে বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি এবং পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করা হয়। দলীয় সূত্রের খবর, পুলিশ পাঠানো, সরকারি পর্যবেক্ষকদের খবর দেওয়ার অনুরোধও আসতে থাকে টেলিফোনে ঘনঘন। ইভিএম বদলানো থেকে কর্মী পাঠানোর অনুরোধও আসে। জেলা দফতরের কি‌ছুক্ষণ পরপর খবর পাঠাতে থাকেন অলোকবাবুরা। ব্লকে ঘুরে ঘুরে প্রার্থীদের সঙ্গে দেখা করে মনোবল চাঙ্গা করা শুধু নয়, পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করতে থাকেন তৃণমূল নেতারা। অলোকবাবু, দীপকবাবুর বলেন, ‘‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে ভোট করেছি। বিরোধীরাই একযোগে গোলমাল, উস্কানি দিয়েছে। প্রয়োজনে পুলিশ-প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়েছে।’’

বিকেলে ফাঁসিদেওয়ায় কিছু বাইক, গাড়িতে শিলিগুড়ি এবং লাগোয়া এলাকার কিছু কর্মীকেও ঘুরতে দেখা যায়। প্রকাশ্যে ভোট দেখতে এসেছেন বললেও তাঁরা ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। তাঁদের কয়েকজন তৃণমূল নেতা ডেকে খাওয়া দাওয়া করে শিলিগুড়ি ফিরে যাওয়ার কথাও বলেন। ওই নেতাদের কথায়, ‘‘রামধনুদের যা অবস্থা, বহিরাগতদের দিয়ে কাজ হবে না। তাই ওদের ফিরে যাওয়াই ভাল। নইলে উল্টো ফলও হতে পারে।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy