তখন সন্ধে সাতটা বাজে। ছেলেকে ব্যাডমিন্টন কোচিং থেকে আনতে যাব বলে বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিলাম। হঠাৎই কলিংবেলের শব্দ। দরজা খুলে দেখি একটি ছেলে। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। গায়ে আকাশি রঙের শার্ট। ভদ্রস্থ চেহারা। সম্ভবত পিঠে একটা ব্যাগও ছিল। জানাল, ক্যুরিয়র সার্ভিসের কর্মী। বলল, আমার নামে চিঠি আছে। এর পরে কাগজ বের করে সই করতে বলায় কলম চাইলাম। ছেলেটি জানাল, ওর কাছেও কলম নেই।
ভিতরের ঘর থেকে কলম খুঁজে নিয়ে বেরিয়ে এসে দেখি যুবক বসার ঘরে চলে এসেছে। দেখেই ঘাবড়ে গেলাম। বিস্ময় কাটিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘আপনি ভেতরে এসেছেন কেন?’’ কথা শেষ না হতেই যুবকটি একটি ছুরি বের করে ফেলল। কঠিন স্বরে বলল, ‘‘আর একটাও কথা বলবেন না।’’ আমার গা হাত-পা তখন ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। টান মেরে সে আমার গলার হার ছিঁড়ে নিল। ডান হাতের চুড়িটাও খুলে নিল। বাঁ হাতের চুড়িটা টেনেও খুলতে না পেরে খেপে গিয়ে বাঁ হাতে ছুরি দিয়ে এক কোপ মারল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গলগল করে রক্ত বেরোতে শুরু করল। রক্ত দেখে মাথা ঘুরতে শুরু করে। মনে হচ্ছিল যেন পড়ে যাব। চিৎকার করার কথাও মনে ছিল না।
হঠাৎই খেয়াল ফিরে পেতেই চিৎকার শুরু করি। সঙ্গে সঙ্গে সে আমাকে ছেড়ে ঘর থেকে পালায়। চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন চলে আসে। আমার স্বামী বিডিও অফিস মোড়ে একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। পড়শিদের থেকে খবর পেয়ে তিনিও বাড়িতে চলে আসেন। খবর পেয়ে আমার আত্মীয়স্বজনরাও চলে আসে। তখনও রক্ত বন্ধ হয়নি। আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাতে দুটো সেলাই করে ক্ষত স্থানে ব্যান্ডেজ করে ছেড়ে দেওয়া হয়।
আমাদের বাড়ি জনবহুল এলাকায়। কিছুটা দূরেই থানা। এখানে এমন ঘটতে পারে তা ভাবতেই পারছি না। শুধু তাই নয় গণেশপুজো, বিশ্বকর্মা পুজোর জন্য বাড়ির পাশে দর্জিপাড়ার রাস্তা দিয়ে লোক চলাচলও অনান্য দিনের তুলনায় বেশি ছিল। তায় ভরসন্ধেয় এই এলাকায় এমন ঘটতে পারে তা কল্পনাতেই ছিল না। থানার সামনেই যদি এমন হতে পারে, তবে তো শহরের কোনও বাড়িই নিরাপদ নয়। তবে কী সর্বক্ষণ আমাদের ঘরে দরজা বন্ধ করে রাখতে হবে?
কাগজে পড়েছি, দু’দিন আগে শিলিগুড়ির মাটিগাড়াতে একই পরিবারের তিন জনকে লুঠের কারণে খুন করা হয়েছে। সেই ঘটনা শুনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। এখন তো নিজেদের বিপন্ন মনে হচ্ছে। তবে মন্দের ভাল যে, যে মালা এবং চুড়ি নিয়ে যুবকটি পালিয়েছি সেগুলি সোনার জল করা ছিল। যেই চুড়িটা নিতে পারেনি, সেটি সোনার ছিল। তবে ভাগ্য ভাল হওয়ায়, প্রাণে বেঁচে গিয়েছি।