Advertisement
E-Paper

পুলিশের জন্য চা-মিষ্টি! জ্বলে উঠলেন গ্রাহকরা

দীর্ঘদিন ধরেই বাগডোগরায় জনমানসে ক্ষোভ জমছিল। থানায় অভিযোগ নিতে অস্বীকার করা, রাজনৈতিক নেতার ফোন ছাড়া তদন্ত না করা, দূরে তদন্তে যাওয়ার জন্য গাড়ির তেল চাওয়া, বিনা মামলায় লক আপে ঢুকিয়ে হেনস্থা করার মতো নালিশ তো ছিলই।

কৌশিক চৌধুরী ও সংগ্রাম সিংহ রায়

শেষ আপডেট: ০৬ মে ২০১৬ ০১:১২
(উপরে) ডাকাতির পরে ব্যাঙ্কের লকার-রুমে পড়ে রয়েছে গ্যাস-কাটার। (নীচে) ব্যাঙ্কে পুলিশের কাছে ক্ষোভ জানাচ্ছেন বাসিন্দারা। ছবি: বিশ্বরূপ বসাক।

(উপরে) ডাকাতির পরে ব্যাঙ্কের লকার-রুমে পড়ে রয়েছে গ্যাস-কাটার। (নীচে) ব্যাঙ্কে পুলিশের কাছে ক্ষোভ জানাচ্ছেন বাসিন্দারা। ছবি: বিশ্বরূপ বসাক।

দীর্ঘদিন ধরেই বাগডোগরায় জনমানসে ক্ষোভ জমছিল।

থানায় অভিযোগ নিতে অস্বীকার করা, রাজনৈতিক নেতার ফোন ছাড়া তদন্ত না করা, দূরে তদন্তে যাওয়ার জন্য গাড়ির তেল চাওয়া, বিনা মামলায় লক আপে ঢুকিয়ে হেনস্থা করার মতো নালিশ তো ছিলই। সেই সঙ্গে ছিল রাতদিন জাতীয় সড়কে গাড়ি ধরে টাকা আদায়ের রমরমা অভিযোগও।

তাই বুধবার রাতে ব্যাঙ্কে লুঠের পরে বৃহস্পতিবার বাগডোগরা পুলিশের বিরুদ্ধে বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেন ফেটে পড়েছে। ফল? তদন্তকারী পুলিশ অফিসারদের জন্য চা-মিষ্টি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সন্দেহে সে সব ব্যাঙ্কের বাইরেই আটকে দিলেন ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। তাঁদের সাফ কথা, এখন কাউকে চা-মিষ্টি খাওয়াতে হবে না। সুতরাং ফেরত গেল সে সব। যদিও পুলিশের দাবি, চা-মিষ্টি তাঁদের জন্য নেওয়া হচ্ছিল না।

পুলিশ সূত্রের খবর, এলাকায় ব্যাঙ্ক ডাকাতির ঘটনার তদন্তে বাগডোগরায় যান শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা থেকে শুরু করে এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিসি (পশ্চিম ও ট্র্যাফিক) শ্যাম সিংহ। তাঁদের দেখা মাত্রই ঘিরে ধরে বিক্ষোভ শুরু করে দেন বাসিন্দারা। স্থানীয় পুলিশ অফিসারদের একাংশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দিক থেকে উড়ে আসতে থাকে নানা অভিযোগ। পুলিশ কমিশনার অবশ্য বলেন, ‘‘ডাকাতির তদন্ত করে সব জানানো হবে, দোষীদের ধরা হবে।’’ এর পরে তাঁরা দ্রুত এলাকা ছাড়েন। এর মধ্যে বাসিন্দাদের একাংশের সঙ্গে রীতিমত তর্কে জড়িয়ে পড়েন ডিসি শ্যাম সিংহ।

ডিসি গলা চড়াতেই ক্ষোভ বাড়তে থাকে এলাকাবাসীদের। কয়েক জন বলেন, ‘‘আমরা সোনা, টাকা হারিয়েছি। লকারে থাকা গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র কোথায় রয়েছে বোঝা যাচ্ছে না। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ গেট বন্ধ করে বসে আছেন। আর ডিসি গলায় চড়িয়ে আমাদের ভয় দেখাতে চাইছেন! নিজেদের দোষ ঢাকার জন্য চিৎকার চেঁচামেচি করলে আমরাও পাল্টা ছাড়ব না।’’ তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন এলাকার কয়েক জন ব্যবসায়ীও। তাঁরা অভিযোগ করেন, বাগডোগরায় পুলিশের নজরদারি একেবারে তলানিতে ঠেকেছে। টহলদারির দুটো ভ্যান থাকলেও একটি সিঙ্গিঝোরা চা বাগানের সামনে, আর একটি কেষ্টপুরে ট্রাক থামাতেই ব্যস্ত থাকে। রাতে বিহার মোড়, পানিঘাটা মোড়ে কোনও কোনও সময় ভ্যান দেখা গেলেও অনেক সময়ই পুলিশ কর্মীদের এক জায়গায় বসে থাকতে দেখা যায়।

সেই সময় প্লেটে করে মিষ্টি আর শিঙা়ড়া নিয়ে এক দোকানি হাজির হন। চাউর হয়ে যায়, পুলিশের জন্যই যাচ্ছে এ সব। তাতে যেন আগুনে ঘি পড়ে। ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা বলতে থাকেন, মানুষ সর্বস্ব খুইয়ে বসে থাকলেও তদন্তকারীদের কয়েক জনকে মিষ্টিমুখ করানোর কথা ভাবা হচ্ছে কেন! ব্যাঙ্কের সামনে বিক্ষোভের জেরে প্লেট নিয়ে ফিরে যেতে হয় দোকানিকে।

নকশালবাড়ি ব্লক কংগ্রেস সভাপতি অমিতাভ সরকারের কটাক্ষ, ‘‘পুলিশের এক বড় অফিসার-সহ কয়েক জন তো নানা কর্মকাণ্ডে ব্যস্ততার কারণে খাওয়া-দাওয়ার সময় পান না। আর কয়েক জন তো খাওয়া-দাওয়ার উপরেই থাকেন। সাধারণ অভিযোগ পর্যন্ত শুনতে চান না। নেতারা ফোন না করলে কাজ হয় না। এই অফিসারদের না সরালে, আজ ডাকাতি হয়েছে, কাল আরও বড় কিছু ঘটে যেতে পারে।’’ সিপিএমের নকশালবাড়ির জোনাল সম্পাদক শীতল দত্ত বলেন, ‘‘বাগডোগরায় পুলিশ আছে বলে মনেই হয় না। যাঁরা আছেন, তাঁরা কয়েক জন নেতাকে খুশি করতেই ব্যস্ত থাকেন। কমিশনারের কাছে অনেকেই জানিয়েছেন। আশা করব, কমিশনার এবার ব্যবস্থা নেবেন।’’

এ দিন বেলা ৪টে অবধি ব্যাঙ্কের ভিতরে তদন্ত হচ্ছে জানিয়ে গেটে তালা মেরে ব্যস্ত থাকেন একাংশ অফিসার। একদল খিদে পাওয়ায় মাথা কাজ করছে না বলে বাসিন্দাদের শান্ত করার চেষ্টাও করে যান। কয়েক জন ব্যবসায়ী জানান, ধিমাল, বাতলাবাড়ি থানা থেকে ১১ কিলোমিটারের মতো। কোনও অভিযোগ করে ৫ লিটার পেট্রোল না দিলে অফিসারেরা যান না। বাইক চুরির হিড়িক বেড়েছে। ডিফেন্স কলোনিতে কয়েক দিন আগে এক ব্যক্তির বাড়িতে চুরি হয়েছিল। অভিযোগই নিতে চায়নি পুলিশ। আবার জাতীয় সড়কের পাশে ৫টি ব্যাঙ্ক, ৩টি পেট্রোল পাম্প-সহ একাধিক সরকারি, বেসরকারি অফিস রয়েছে। রাতে সেগুলি প্রায় অরক্ষিত থাকে। অথচ কয়েক বছর আগে পেট্রোল পাম্পে টাকা লুঠ, সোনার দোকানের সামনে বোমাবাজির ঘটনা আরও বাসিন্দারা ভোলেননি।

বাগডোগরা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তথা বাগডোগরার তৃণমূল নেতা প্রবীর রায়ও পুলিশের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, ‘‘পুলিশকে আরও সজাগ হতে হবে। আমরা বলেছি, দ্রুত দোষীদের চিহ্নিত করতে হবে।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy