এক দিকে রাজ্যের শাসক দল, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী থেকে একাধিক নেতা। অন্য দিকে, রাজ্যের দুই দশকের ‘প্রভাবশালী’ প্রাক্তন মন্ত্রী তথা শহরের বর্তমান মেয়র।
মাটিগাড়ার গোলমালের জেরে দুই তরফের অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগকে সামাল দিতে গত ২৪ ঘন্টায় ধরে জেরবার হয়ে রয়েছে শিলিগুড়ি পুলিশ।
কোনও সময় পুলিশকে উর্দি ছেড়ে শাসক দলে নাম লেখানোর পরামর্শ ছাড়াও মামলার হুমকির মুখে যেমন পড়তে হচ্ছে। তেমনই, এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা, গণতন্ত্র বজায় রাখায় লড়াই-এ সভা, মিছিলে পুলিশ দরকার নেই বলেও প্রকাশ্য সভায় ঘোষণাও করেছেন শাসক দলের নেতারা। আবার দুই পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে আইন মেনে মামলাও করতে হয়েছে পুলিশকে। সেখানে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে আপাতত পরিস্থিতি সামাল দিলেও মহকুমা পরিষদের নির্বাচনের আগে শিলিগুড়ি সরগরম হয়ে উঠল বলে পুলিশের একাধিক অফিসারেরা মনে করছেন।
অক্টোবর নাগাদ শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের নির্বাচন হতে পারে। গতবার বোর্ড সিপিএমের দখলে থাকলেও শেষে তা তৃণমূলের হাতে যায়। এবার সেই বোর্ড দুই পক্ষই ধরে রাখার মরিয়া চেষ্টা করবে বলে পুলিশ অফিসারেরা মনে করছেন। আর তাতেই উত্তেজনা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা।
শনিবারের মাটিগাড়ার বালাসন কলোনিতে দুই পক্ষের গোলমালের পর সেখানে পুলিশ পিকেট বসানো হয়েছে। পুলিশ সূত্রের খবর, আগামীতে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সভা, মিছিলের অনুমতি এবং পুলিশ ঠিকঠাক থাকা নিয়ে এদিনও কমিশনারেটের পুলিশ অফিসারেরা বৈঠক করেছেন। এদিন বিকালে মাটিগাড়ায় উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী গৌতম দেবের সভায় যেমন প্রচুর পুলিশ ছিল। তেমনই অশোক ভট্টাচার্য, মহম্মদ সেলিমদের প্রতিবাদ মিছিলেও পুলিশ পাহারা রাখা হয়। শহরের হাসমিচকে দিনভরই বিরাট সংখ্যক পুলিশকর্মীদের মোতায়ন রাখা হয়।
পুলিশ অফিসারদের কথায়, কোনও ঘটনা ঘটে গেলেই প্রথমে অভিযোগের আঙুল ওঠে পুলিশের দিকেই। বিরোধীরা তো বটেই কোনও কোনও সময় শাসক দলের তোপের মুখে পুলিশকে পড়তে হয়। পুরসভা নির্বাচনের আগে এমন ঘটনা ঘটেছে। মাটিগাড়ার ঘটনা আরও মাত্রা বাড়িয়েছে। যদিও পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা বলেছেন, ‘‘আমরা সর্বত্র আইন মেনে ব্যবস্থা নিচ্ছি। কোথাও যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে তা দেখা হচ্ছে।’’
মাটিগাড়ায় তৃণমূলের পক্ষ থেকে করা অভিযোগের ভিত্তিতে অশোকবাবু, জীবেশ সরকার সহ মোট ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। তার ভিত্তিতে তল্লাশি চালিয়ে মাটিগাড়ার বালাসন কলোনি থেকে প্রদীপ রায়, দর্শন রায় এবং আশিস বর্মন নামে তিন জনকে গ্রেফতার করে শনিবার রাতেই। রবিবার তাঁদের শিলিগুড়ি আদালতে পেশ করা হয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে হামলা, খুনের চেষ্টা, মারধর, শ্লীলতাহানি, অস্ত্র দেখিয়ে ভীতি প্রদর্শন সহ একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। যদিও মামলায় দুই পক্ষের বয়ান শুনে ধৃতদের জামিনের আবেদন মঞ্জুর করেছে আদালত। আবার পুলিশ নিজে সিপিএম নেতাদের বিরুদ্ধে বিনা অনুমতিতে মিছিল করার মামলাও দায়ের করেছে।
সিপিএমের অভিযোগের ভিত্তিতেও দুটি মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ বলে জানা গিয়েছে। অভিযোগের তালিকায় তৃণমূলের আঠারাখাই এলাকায় নেতা দুর্লভ চক্রবর্তী, মলীন বর্মন, জগদীশ বর্মন, নকুল বর্মনের মতো নেতারা রয়েছেন বলে পুলিশ সূত্রের খবর। তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা, মারধরের মামলা হয়েছে। সিপিএম একটি অভিযোগ করে পার্টি অফিস ভাঙচুরের পর শুক্রবার। পরে মিছিল নিয়ে গোলমালের জেরে শনিবার আরেকটি অভিযোগ হয়েছে। যদিও তৃণমূলের কাউকে ধরা হয়নি বলে সিপিএমের অভিযোগ।
সিপিএম নেতা অশোকবাবু বলেন, ‘‘পুলিশ তো মন্ত্রীর কথায় উঠছে বসছে। ঘটনার সময় পুলিশ কমিশনারকে টেলিফোন করলেও তিনি ধরেননি। মেসেজে মিটিং-এ ব্যস্ত আছেন বলে জানিয়েছেন। পরবর্তীতে এসএমএসে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানালে তিনি টেলিফোন করেন। পরবর্তীতে একজন আইপিএস অফিসার এসে মিথ্যা বিবৃতি দিয়েছেন। আমরা শ্যাম সিংহ নামে ওই অফিসারের বিরুদ্ধে মামলা করব। শহরের মেয়রকেই আক্রান্ত হয়ে পুলিশকর্মীদের পাশে পেতে যদি এই অবস্থা পোহাতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কী দশা তা বোঝাই যাচ্ছে।’’
পুলিশের তরফে এদিন অশোকবাবু বক্তব্য ঘিরে কেউ কোনও মন্তব্য করেননি। তবে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী গৌতম দেব জানিয়েছেন, পুলিশ পুলিশের কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘‘ওঁরা অনুমতি ছাড়া মিছিল করবেন। লোকজনকে মারবেন। ভাঙচুর করবেন। আবার পুলিশের সহায়তাও চাইবেন, এটা কেমন নাটক। মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজন হলেই আমরা গোটা মহকুমা পরিষদ এলাকায় তা প্রতিরোধ করব।’’