স্রেফ উদ্বোধনের ঘটা সামাল দিতেই প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। কিন্তু, কদিনের মধ্যেই প্রকল্প শিকেয়। কোথাও পড়ে আছে ভাঙা ‘ফিসিং চেয়ার’। বাহারি ছাতা খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অনেকদিন আগেই। সাগররদিঘির টলটলে জলের মাছ খাওয়ার স্বাদ এখন আর মিটছে না বাঙালির। বলা যায়, উদ্বোধনের কয়েক মাসের মধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়েছে কোচবিহারের সাগরদিঘিতে আমজনতার জন্য মাছ ধরার প্রকল্প। ফলে, বিরোধী দল তো বটেই, মৎস্য শিকারিদের অনেকের অভিযোগের তির গিয়েছে তৃণমূলের জেলা সভাপতি তথা রাজ্যের পরিষদীয় সচিব রবীন্দ্রনাথ ঘোষের দিকে।
কারণ, তিনিই বছর খানেক আগে ধুমধাম করে ওই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। কয়েক ঘণ্টা ধরে দিঘিতে মাছ ধরার জন্য ছিপ নিয়েও বসে থাকেন তাঁরা। উদ্বোধনের পর তাঁরা জানান, পর্যটনকে উৎসাহ দিতেই ওই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই প্রকল্পের এমন হাল কেন? বিরোধীরা অভিযোগ করেছেন, কোনও পরিকল্পনা ছাড়া অযথা সরকারি কোষাগার থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করা হয়েছে বলেই প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। রবীন্দ্রনাথবাবু বলেন, “পুকুরে মাছ ছিল না। তাই সে সময় মাছ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই সমস্যা হয়। এখন মাছ ছাড়া হয়েছে। আবার মাছ ধরা শুরু হবে। আর সাগরদিঘি সৌন্দর্যায়নের কাজ চলছে।” বাম, বিজেপি, কংগ্রেসের অনেকের বিস্ময়, মাছ যে নেই তা উদ্বোধনের পরে জানা গেল! বিজেপির কোচবিহার জেলার সাধারণ সম্পাদক নিখিলরঞ্জন দে বলেন, “কোনও পরিকল্পনা নেই। শুধু সরকারি কোষাগারের টাকা খরচ করা লক্ষ্য হলে এমনই দশা হবে প্রকল্পের। কোচবিহারের মানুষ এ সব বরদাস্ত করবেন না।’’
যদিও জেলাশাসক পি উল্গানাথন জানান, পর্যটকদের আকর্ষণে সাগরদিঘি সাজতে কাজ হচ্ছে। ফের মাছ ধরা শুরু করা হবে। মৎস্য দফতরের কোচবিহারের জেলা আধিকারিক অলোক প্রহরাজ বলেন, “জলে ঠিকমতো শোধিত না হওয়ায় সেই সময় কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছিল। অনেকে টিকিট কেটে ছিপ ফেলে বসে থেকে মাছ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন। ক্ষোভ বাড়তে থাকায় বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মাছ ধরা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন জল শোধনের কাজ হয়েছে। ফের মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া হবে।”
মৎস্য দফতর সূত্রের খবর, রাজ্যে নতুন সরকার আসার পর থেকেই সাগরদিঘির সৌন্দর্য়ায়ন নিয়ে নানা পরিকল্পনা হয়। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সাগরদিঘি দমদমের একটি বেসরকারি সংস্থার হাতে চুক্তির মাধ্যমে লিজ দেওয়া হয়। ঠিক হয়, পাঁচ বছর ওই সংস্থার অধীন থাকবে দিঘি। তাঁরা প্রথম বছরের লিজ হিসেবে ৮৫ হাজার টাকা দেবে দফতরকে। পরের বছরগুলিতে পাঁচ শতাংশ হারে টাকা বৃদ্ধি পাবে। ওই সংস্থা সাগরদিঘিতে মাছ ধরার পাশাপাশি বোটিং, লাইট ও সাঊন্ডের কাজ, ক্যান্টিন চালু-সহ নানা কাজের পরিকল্পনা নেয়। ওই বছরের জুন মাসে মাছ ধরা শুরু হয় ওই দিঘিতে।
অভিযোগ, উদ্বোধনের দিনই পঞ্চাশ হাজার টাকার উপরে খরচ করা হয়। মঞ্চ বেঁধে উদ্বোধন, টিফিনের প্যাকেট খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল সেখানে। দিঘির চারপাশে ১১২টি ফিসিং চেয়ার বসানো হয়। সেগুলি তৈরি করা হয়েছিল বাঁশ দিয়ে। চেয়ারের উপরে বসানো হয় বাহারি ছাতাও। ওই দিন থেকেই প্রতি রবিবার সকাল ৬টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত তিন হাজার টাকার বিনিময়ে একটি ছিপে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়া হয় দুজনকে। মৎস্য দফতর ওই দিঘিকে রাজ্যে প্রথম মৎস্য শিকারভুক্ত দিঘি হিসেবে ঘোষণা করে। দিন কয়েকের মধ্যে তা নিয়ে অভিযোগ উঠতে শুরু করে। অনেকে তিন হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটে সারাদিন কোনও মাছ পাননি বলে মৎস্য দফতরে অভিযোগ জানান। ক্ষোভ বাড়তে থাকায় মাছ ধরার টিকিটের দাম কমিয়ে দেড় হাজার টাকা করা হয়। তার পরেও অভিযোগ ওঠে, কোনও মাছই মিলছে না দিঘি থেকে। শেষপর্জন্ত ফেব্রুয়ারি মাসে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মৎস্য দফতর সূত্রেরই খবর, সেই সময় জল ঠিকমতো শোধন না করায় সমস্যা তৈরি হয়েছিল। মাছ বড় হচ্ছিল না। সে কারণেই মাছ শিকারিরা সারাদিন ছিপ ধরে বসে থেকেও মাছ পাচ্ছিলেন না। তাই মাছ ধরার উপরে আপাতত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
গত তিন মাস ধরে মাছ ধরা বন্ধ সাগরদিঘিতে। যে সংস্থা সাগরদিঘি পাঁচ বছরের জন্য লিজে নিয়েছেন সেই সংস্থার কর্তা মুকুট রায়চৌধুরী জানান, তাঁরা সাগরদিঘিতে প্রায় ৯ টন মাছ ছেড়েছিলেন। এ ছাড়াও নানা কাজ করতে গিয়ে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। টাকা উঠে এসেছে সামান্যই। তিনি বলেন, “জল পরিশোধনের কাজ শেষ হয়ে এসেছে। এখন আর অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।”
ছবি: হিমাংশুরঞ্জন দেব।