ক্রমশ আরও রুগ্ণ হয়ে পড়া হিমূলের কর্মীদের পাশে দাঁড়ালেন শিলিগুড়ির মেয়র অশোক ভট্টাচার্য। গত শুক্রবার থেকে হিমূলের প্যাকেটজাত দুধ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। সরকারি এই ডেয়ারি সংস্থার সূত্রে জানা গিয়েছে, সরবারহকারীদের পাওনা না মেটানোয় কাঁচামাল পাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কাঁচামালের অভাবে গত শুক্রবার থেকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় হিমূলে। কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, পরিচালন ব্যবস্থার গাফিলতির জেরেই দুধ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। শনিবার সকালে শিলিগুড়ি লাগোয়া মাটিগাড়ায় হিমূলের কারখানা তথা অফিসে গিয়েছিলেন মেয়র তথা প্রাক্তন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্য। হিমূলের ডান-বাম তিন দলের সংগঠন থাকলেও, কর্মীরা ‘হিমূল বাঁচাও কমিটি’ নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করেছে। এ দিন সকালে অশোকবাবু সংস্থার অফিসে গিয়ে কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। সমস্যার কথা শোনেন। হিমূলকে বাঁচাতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি লিখবেন বলেও জানিয়েছেন অশোকবাবু।
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অশোকবাবু এ দিন বলেন, ‘‘কোনও রাজনৈতিক কারণে নয়, এতদিনের পুরোনো এবং জনপ্রিয় ডেয়ারি বন্ধ হয়ে যাবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমার সন্দেহ, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগসাজশে পরিকল্পনামাফিক এই সংস্থাকে বন্ধ করার চক্রান্ত হচ্ছে। হিমূলকে বাঁচাতে রাজ্যকে পদক্ষেপ করতে হবে। এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখব।’’
অশোকবাবুর কাছে এ দিন সংস্থার কর্মীদের একাংশ অভিযোগ করেন, মূলত পরিচালনার গাফিলতির কারণেই ডুবতে বসেছে সত্তরের দশকে শুরু হওয়া এই সংস্থা। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দার্জিলিঙের জেলাশাসক পদাধিকারী বলে সংস্থার চেয়ারম্যান এবং পদাধিকার বলে অতিরিক্ত জেলাশাসক পদমর্যাদার এক আধিকারিক সংস্থার মুখ্য কার্যনিবার্হী আধিকারিক (সিইও) হয়ে এসেছেন। কয়েকবছর ধরে জেলাশাসক বা অতিরিক্ত জেলাশাসকরা দার্জিলিঙে বসেই হিমূলের কাজ পরিচালনা করেছেন। যার জেরে সংস্থার দৈনন্দিন সমস্যা সম্পর্কে তাঁরা ওয়াকিবহাল নন বলে অভিযোগ। সংস্থার পরিচালনা ব্যবস্থা ক্রমাগত দুর্বল হওয়ায় এমন ঘটেছে বলে অভিযোগ।
পরিচালনার গাফিলতির কারণেই এবারে উৎপাদন বন্ধ হয়েছে বলে অভিযোগ। সরবারহকারীদের বরাত মেটাতে তৈরি হওয়া চেকে সিইও-র সই না হওয়ায় পাওনা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পরে সিইও তথা অতিরিক্ত জেলাশাসক ইউ স্বরূপ সংস্থার প্রতিদিনের হিসেব তৈরি করতে নির্দেশ দেন বলে জানা গিয়েছে। যদিও, রাতারাতি হিসেব পদ্ধতি বদলে ফেলা সম্ভব নয় বলে কর্মীদের একাংশ জানিয়েছেন। বদলানোর প্রক্রিয়া চলাকালীন ধাপে ধাপে সরবারহকারীদের পাওনা মেটালেই উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো বলে কর্মীরা মনে করছেন। দূরে বসে সংস্থা পরিচালনা করলে এমনই সমস্যা তৈরি হওয়ার কথা বলে কর্মীদের একাংশের অভিযোগ।
সমস্যার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন জেলাশাসক তথা হিমূলের চেয়ারম্যান অনুরাগ শ্রীবাস্তবও। তিনি বলেন, ‘‘সমস্যার কথা শুনেছি। কেন্দ্রীয় একটি পরিদর্শন দল জেলায় এসেছে। সে কারণে অতিরিক্ত জেলাশাসক ব্যস্ত রয়েছেন। তবুও, আমি তাঁকে সমস্যা মেটাতে পদক্ষেপ করতে বলেছি।’’
উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে লোকসানের আশঙ্কাও। গত শুক্রবার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার সময় প্রায় ৩৫ হাজার লিটার দুধ মজুত ছিল। গুড়ো পাউডার সহ বিভিন্ন উপাদন মিশিয়ে প্যাকেটজাত করা যায়। সেই দুধ তিনদিনের বেশি রাখলে গুণমান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে উৎপাদন শুরু না হলে সব দুধ নষ্ট হবে। শুধু তাই নয়, ৩৬ হাজার লিটার দুধকে ‘শীতল’ যন্ত্রে রাখতেও তিনদিনে অন্তত লক্ষ টাকা বাড়তি খরচ হবে বলে জানানো হয়েছে। হিমুল বাঁচাও কমিটির তরফে সুধাংশু তারুয়া অভিযোগ করে বলেন, ‘‘পদাধিকারের ভিত্তিতে নয়, সংস্থার শীর্ষপদে একজন স্থায়ী কর্তা না বসালে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। এটা বুঝেও কেন পদক্ষেপ হচ্ছে না, বুঝতে পারছি না। আমরা শতাধিক কর্মী পরিবার নিয়ে পথে বসার আশঙ্কায় রয়েছি।’’
একসময়ে প্রায় পাঁচশো কর্মী-আধিকারিক থাকলেও, এখন সংস্থার কর্মী সংখ্যা ১০৭ জন। বছর দুয়েক ধরে পিএফ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কর্মীদের বকেয়া ডিএ-এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৯ শতাংশ। পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছে কর্মী আবাসন। নজরদারির অভাবে সীমানা পাঁচিল ভেঙে কর্মী আবাসনের দরজা, জানালা, ইঁট চুরি হচ্ছে বলে অভিযোগ। পুরো চত্বরটি ঢেকে গিয়েছে আগাছায়। ভবনের দেওয়াল ফাঁটিয়ে দিয়েছে গাছের শিকর। দুষ্কৃতীরা এসে চত্বরের গাছ কেটেও নিয়ে যায় বলে অভিযোগ। এক কর্মীর কথায়, ‘‘শীর্ষকর্তাদের লিখিত নির্দেশ ছাড়া একটি বাল্ব কেনাও সম্ভব নয়। শীর্ষকর্তারা তো নিয়মিত সংস্থাতে আসেন না, তাই কোনও দুর্দশাই তাঁদের মালুম পড়ে না।’’
প্রায় ৩৫ একর জুড়ে হিমূলের কারখানা, অফিস চত্বর রয়েছে। এক সময়ে কারখানার শব্দ, কর্মীদের উপস্থিতিতে যে চত্বর মুখর ছিল, এখন সেই চত্বরই পোড়োবাড়ির আকার নিয়েছে বলে এলাকাবাসীদের দাবি।