Advertisement
E-Paper

সংলাপ হারিয়ে ‘ফিমেল’ এখন চা দোকানি

একসময় হুইসল বাজিয়ে ছোট লাইনের ট্রেন চলে যেতেই গুটি গুটি পায়ে কিছু মানুষ দু’পাশের গদিঘরমুখো হত। দূর দূর গ্রাম থেকে আসা সেই সব নায়েক পার্টি বিস্তর দরাদরি করে ঠিক করে নিত ফিমেল।

অর্ঘ্য ঘোষ

শেষ আপডেট: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০১:৪৮
একদিন বায়না আসবে, এই আশাতেই এখনও সাজ-সরঞ্জাম যত্নে রাখে যাত্রাপাড়া।

একদিন বায়না আসবে, এই আশাতেই এখনও সাজ-সরঞ্জাম যত্নে রাখে যাত্রাপাড়া।

একসময় হুইসল বাজিয়ে ছোট লাইনের ট্রেন চলে যেতেই গুটি গুটি পায়ে কিছু মানুষ দু’পাশের গদিঘরমুখো হত।

দূর দূর গ্রাম থেকে আসা সেই সব নায়েক পার্টি বিস্তর দরাদরি করে ঠিক করে নিত ফিমেল। নায়কের পোশাক, সিনের বাজনদার অথবা আলোকশিল্পীকে।

সে দিন গিয়াছে। হুইসল দিতে দিতে ছোট লাইনের ট্রেন আর আসে না। কেউ আর তেমন বায়না করতে ভিড় জমায় না গদিঘরের সামনে। অবলুপ্তির পথে লাভপুরের ষষ্ঠীনগর তথা গরুর হাট সংলগ্ন যাত্রাপাড়া। পেটের দায়ে ঝাঁপ বন্ধ করে যাত্রার গদিঘর ছেড়ে, বেশিরভাগই এখন খুঁজে নিচ্ছেন অন্যপেশা।

‘‘শুধু রঙ মেখে সং সাজাই সার! জানেন, সংসার চলে না। ঠিক মতো ছেলেমেয়েদের মুখে দু’মুঠো তুলে দিতে পারি না। এখন তেমন আর যাত্রার বায়না আসে কই।’’ বলছিলেন, যাত্রা পাড়ার এক প্রবীণ শিল্পী। তাঁর স্মৃতিতে ধরা পড়ল ফেলে আসা যাত্রামহল্লার রঙিন ছবি। একসময় বন্ধ হয়ে যাওয়া ছোটলাইনের দু’ধারে যাত্রাদলের ১০-১২টি গদিঘর সরগরম থাকত। জেলা বা জেলার বাইরে থেকে নায়েক পার্টিরা বায়না করতে হাজির হতেন। মূলত মহিলা শিল্পী, যন্ত্রী এবং পোশাকের বায়না করতে আসতেন শখের যাত্রা দলের ওইসব নায়েকরা। আবার কখনও বা গোটা একটি যাত্রাপালারও বায়না হত। সব মিলিয়ে সকাল থেকে গমগম করত পাড়া। সে সময় যাত্রাপাড়াকে কেন্দ্র করেই প্রায় তিন শতাধিক শিল্পীর ভাত কাপড়ের সংস্থান হয়েছে। ভাগ্য বিড়ম্বিত বহু মহিলা যাত্রাপাড়ায় অভিনেত্রী হিসাবে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে নিয়েছিলেন।

সেই যাত্রাপাড়াই আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। কোনও রকমে টিম টিম করে টিকে রয়েছে মাত্র ২টি অপেরা। কিন্তু তাদেরও অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে। বিপন্ন হয়ে পড়েছেন শিল্পীরাও। এমনিতেই পারবারিক বিপর্যয়ের শিকার হয়ে কোনও রকমে বেঁচে থাকার জন্য একদিন অভিনয়কে জীবিকা হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন ৫৫ বছরের নারায়ণী গোস্বামী, ৫৩ বছরের কৃষ্ণা মুখোপাধ্যায়, ৫৬ বছরের শিবানী মুখোপাধ্যায়, ২৭ বছরের চন্দনা অধিকারীরা। তখন রাতের পর রাত মানুষকে অভিনয় করে আনন্দ দিয়েছেন তাঁরা। আজ তাঁদের অধিকাংশেরই পরানুগ্রহে কোনওরকমে অর্ধাহারে একলা চোখের জলে দিন কাটছে। কারণ নিত্যনতুন বিনোদনের দাপটে শখের যাত্রা কার্যত হারিয়েই গিয়েছে। তাই আর ডাক পান না শিল্পীরা। সরকারি অনুদানও মেলে না বলে অভিযোগ।

মাত্র ১৬ বছর বয়সেই যাত্রায় নেমেছিলেন লাভপুর রামকৃষ্ণ অপেরার বর্তমান কর্ণধার নারায়ণী গোস্বামী। শৈশবেই মা’কে হারান। বাবা ছিলেন নামে মাত্র বেতনে কীর্ণাহারের একটি স্কুলের নাইটগার্ড। স্কুলে নকশাল হামলার জেরে সেই কাজও হারাতে হয়। পাঁচ ভাইবোনের বড় নারায়ণীদেবীর পড়া এগোয়নি প্রাথমিকের বেশি। স্রেফ দু’বেলা দুটি ভাতের জন্য বাবা তাঁকে রেখে আসেন কাটোয়ার এক অভিনেত্রীর বাড়িতে। সেখানে পরিচারিকার কাজের পাশাপাশি চলত অভিনয় শিক্ষা। তারপর পালা প্রতি ৩০ টাকার চুক্তিতে নাম লেখান বোলপুরের একটি যাত্রাদলে। সেখান থেকেই ‘মেকআপ ম্যানের’ সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন। কিন্তু ৩ বছরের মাথায় বিচ্ছেদ ঘটে স্বামীর সঙ্গে। তখন ২ বছরের ছেলেকে মানুষ করতে আরও বেশি করে যাত্রাকেই আঁকড়ে ধরেন। পরে নিজে দলও খোলেন। কিন্তু সে রকম বায়না আর হয় না বলে এখন তেলেভাজার দোকান করেছেন।


কেউ কেউ অবশ্য সে আশা ছেড়ে এখন চায়ের দোকানে। ছবি: সোমনাথ মুস্তাফি

একই পরিস্থিতি ৫৩ বছরের কৃষ্ণাদেবীর। ১৮ বছর বয়েসেই ভিনদেশী এক যুবকের সঙ্গে বিয়ের নামে প্রতারণার শিকার হন তিনি। অন্তঃস্বত্ত্বা অবস্থায় তাঁকে ফেলে বেপাত্তা হয়ে যায় সেই যুবক। তখন দু’চোখে অন্ধকার নেমে আসে তাঁর। বাবা হারমোনিয়াম সারাতেন। যাত্রাদলের লোকেরাও আসতেন হারমোনিয়াম সারাতে। সেই সূত্রে যাত্রাদলে নাম লেখান কৃষ্ণাদেবীও। যাত্রা করেই ছেলেকে মানুষ করেছেন। এখন সেই ছেলেরা আলাদা সংসার পেতেছে। বিড়ি বেঁধে কিংবা ধুপকাঠি তৈরি করে কোনওরকমে দিন চলছে কৃষ্ণাদেবীর।

কি বলছেন শিল্পীরা?

‘‘এই পেশায় মুখে রঙ মেখে আমরা যা পাই তাতে সংসার চলে না। প্রাপ্য সম্মান জোটেও না। পোস্টারে বাজনা, পোশাকের পাশাপাশি আমাদের জন্য লেখা হয় ফিমেল ভাড়া পাওয়া যায়! যাত্রাদলের মেয়ে মানে সবাই ধরেই নেয় আমরা সস্তা। কি নায়েক পার্টি, কি দল কোথাও প্রাপ্য মর্যাদাটুকু পর্যন্ত মেলে না! পেটের তাগিদে হাত বদল হতে হতে ঘুরতে থাকি। নতুন সরকার আসার পর শুনেছিলাম, অনুদান দেওয়ার কথা। নেতাদের কথা মতো তৃণমূলের স্থানীয় অফিসে আবেদনপত্রও জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু ওই পর্যন্তই!’’

এ কথা কেবল কৃষ্ণা, নারায়ণীদের নয়। একই জীবনকথা লাভপুরেরই চন্দনা অধিকারী, উত্তর ২৪ পরগনার শিবানী মুখোপাধ্যায়দেরও। জেলার দলের পাশাপাশি অন্যান্য দলেও কাজ করেছেন তাঁরা। কলকাতার নামী যাত্রাদলেও জর্জ বেকার, শকুন্তলা বড়ুয়াদের সঙ্গেও অভিনয় করেছেন শিবানীদেবী। কিন্তু অর্থ কষ্টে জর্জরিত জীবন। শিবানী বলেন, ‘‘কষ্টে আছি। শিল্পীদের বৃদ্ধ বয়সটা খুবই দুঃসহ। কেউ খোঁজটুকু পর্যন্ত নেয় না। সঞ্চয় বলতেও কিছুই নেই। শুনেছি সরকার নাকি লোকশিল্পীদের জন্য অনেক কিছু ঘোষণা করেছেন। কিন্তু তার নাগাল আমরা পাইনি!’’

কষ্ণাদেবীর কাতর প্রশ্ন, ‘‘তাহলে কি আমরা ওই আওতায় পড়ি না? শ্রীরামকৃষ্ণই তো বলে গিয়েছেন যাত্রায় ‘লোক শিক্ষে’ হয়। সেই লোকশিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থেকে আমরা জীবনে কি পেলাম!’’

গোটা যাত্রাপাড়া জুড়েই মনখারাপের হাওয়ায় একই জিজ্ঞাসা ঘুরছে। জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি আধিকারিক তাপস ভায়াল বলেন, ‘‘সাধারণত যাত্রা শিল্পীদের যাত্রা অ্যাকাডেমি অনুদান দেয়। শিল্পীরা সংস্থাগতভাবে বা ব্যক্তিগতভাবে আবেদন করতে পারেন। আমরা কলকাতার যাত্রা অ্যাকাডেমির কাছে পাঠিয়ে দেব।’’

সারদা অপেরার কর্ণধার মুক্তিপদ দাস, মেকআপম্যান নিমাই হাজরার অবশ্য আর ভরসা হয় না নেতা-মন্ত্রী, সরকারি কর্তাদের কথায়। তাই অপেক্ষায় চেয়ে আছেন ছোট লাইনের ট্রেনের পথেই। ফের কবে নায়েকরা ফিরবে বুকিং নিয়ে সেই অপেক্ষাতেই তাঁরা চেয়ে আছেন দূর দূর গ্রামের মাঠ চিরে চলে যাওয়া ধূ ধূ রেলপথের দিকে!

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy