Advertisement
E-Paper

শৈশব কেড়েছে সমাজ, অনিশ্চিত কলেজের পাঠও

বাবা মারা গিয়েছেন। মা কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত। আদ্রার মণিপুর কুষ্ঠ পুনর্বাসন কলোনির এক চিলতে ঘরে মা আর ছেলে মিলে কোনও রকমে মাথা গুঁজে থাকেন। দিন চলে ভিক্ষা করে। সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করে দয়াল মহান্তি নামে সেই ছেলে এ বার কলা বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে ৭২.৬ শতাংশ নম্বর পেয়ে। কিন্তু তার পরে ভাঙা ঘরে অন্ধকার বেড়েছে বই কমেনি।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৪ মে ২০১৬ ০২:০০
দয়াল মহান্তি। —নিজস্ব চিত্র

দয়াল মহান্তি। —নিজস্ব চিত্র

বাবা মারা গিয়েছেন। মা কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত। আদ্রার মণিপুর কুষ্ঠ পুনর্বাসন কলোনির এক চিলতে ঘরে মা আর ছেলে মিলে কোনও রকমে মাথা গুঁজে থাকেন। দিন চলে ভিক্ষা করে। সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করে দয়াল মহান্তি নামে সেই ছেলে এ বার কলা বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে ৭২.৬ শতাংশ নম্বর পেয়ে। কিন্তু তার পরে ভাঙা ঘরে অন্ধকার বেড়েছে বই কমেনি।

এত দিন দয়ালের পড়াশোনার খরচ দিত কুষ্ঠ পুনর্বাসন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। কিন্তু স্নাতক স্তরের পড়াশোনার খরচ জোগানো তাঁদের পক্ষে আর সম্ভব নয়। এর ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে মেধাবী ছেলেটির ভবিষ্যৎ। তার ইচ্ছে, ভূগোল বা ইতিহাস নিয়ে স্নাতক স্তরের পড়াসোনা করে আইএএস বা আইপিএস অফিসার হওয়ার। কিন্তু সেই ইচ্ছা স্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে কি না তা এখন দয়ালের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরে সমাজ, পরিজনরা সরে গিয়েছিলেন। বাঘমুণ্ডির দম্পতি মানিক মহান্তি ও শান্তবালা মহান্তির ঠাঁই হয়েছিল মণিপুরের কুষ্ঠ পুনর্বাসন কেন্দ্রে। এই গ্রামেই তাঁদের ছেলে দয়ালের জন্ম। বড় হয়ে ওঠা।

আর পাঁচ জনের মতো সুস্থ হলেও দয়ালের বড় হয়ে ওঠার সময়টা জুড়ে চারপাশের অনেকেই আড়চোখে তাকিয়েছেন তার দিকে। বই হয়ে উঠেছিল পরেশের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। দয়াল মাধ্যমিক স্তরে পড়ার সময়ই মানিকবাবুর মৃত্যু হয়। মেধাবী ছাত্রটি হাল ছাড়েনি। মাধ্যমিকে ভাল ফল করার পরে রঘুনাথপুর হাইস্কুলে কলা বিভাগে ভর্তি হয়েছিল।

সেই সময় দয়ালে পাশে ছিল পুনর্বাসন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির সম্পাদক নবকুমার দাস জানান, কুষ্ঠ আক্রান্ত পরিবারগুলির ছেলেমেয়েদের জন্য তাঁরা অরুণোদয় শিশু নিকেতন নামে একটি হোম চালান। এত দিন সেখানে থেকে পড়াশোনা করেছে দয়াল। নবকুমারবাবু বলেন, ‘‘মূলত রাজ্য সমাজকল্যাণ দফতরের অনুদানেই হোমের আবাসিকদের খাওয়া-পড়ার খরচ চলে। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের অনুদান বকেয়া পড়ে রয়েছে। এই অবস্থায় উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হওয়া হোমের পড়ুয়াদের কলেজে পড়ার খরচ জোগানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

দয়াল একা নয়, এই বছর কলোনির মোট পাঁচ জন পড়ুয়া উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই দুঃস্থ পরিবার থেকে এসেছে। তাদের সবার ভবিষ্যত এখন একই রকম অনিশ্চিত। হোম সূত্রে জানা গিয়েছে, আবাসিক পিছু মাসে ১১৫০ টাকা অনুদান মেলে। তা দিয়েই আবাসিকদের খাওয়া, জামাকাপড়, থেকে শুরু করে পড়াশোনার খরচও চলে। ওই টাকা থেকেই মেটাতে হয় হোমের বিদ্যুতের বিল। দেওয়া হয় কর্মীদের ভাতা। এই পরিস্থিতিতে আবাসিকদের কলেজে পড়ার খরচ টানা প্রায় অসম্ভব বলে জানান নবকুমারবাবু। তিনি বলেন, ‘‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। এই ভাবে ছেলেমেয়েগুলোকে কলেজে পড়াবো কী ভাবে?’’

ভিক্ষা করে দিন গুজরান হয় শান্তবালাদেবীর। ছেলের পড়াশোনার খরচ বহন করার উপায় তাঁর নেই। এক সময় সমাজ তাঁকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। তাঁর স্বপ্ন, মেধার জোরে দয়াল নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। কিন্তু স্বপ্নপূরণে কঠিন পথের সামনে দাঁড়িয়ে দয়াল বলে, ‘‘টাকার অভাবে বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে পারিনি। কিন্তু এ বারে হয়তো একেবারে পড়াশোনাই বন্ধ হয়ে যাবে।’’

ছাত্রটির পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন রঘুনাথপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক তাপসকুমার দত্ত। তবে কলোনির কর্মকর্তারা বলেন, ‘‘সমাজের কুসংস্কার যে ছেলেমেয়েগুলির শৈশব মেঘে ঢেকে রেখেছিল, সাহায্য হাত পাশে পেলে তাদের বাকি জীবনটা অন্তত আলোকিত হতে পারে।’’

HS Student Result
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy