রাজ্য জুড়ে বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের জয়জয়কার হলেও পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুর পুরসভায় মোটেই শাসকদল স্বস্তিতে নেই। লোকসভা ভোটের তুলনায় এই পুর-শহরে বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের ভোটপ্রাপ্তি বাড়লেও অধিকাংশ ওয়ার্ডেই এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। জেলা রাজনীতির ওঠাপড়ার নিয়মিত পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই ফলাফলে বিজেপি যতটা স্বস্তিতে, ততটাই চাপে তৃণমূল শিবির।
মেয়াদ ফুরনোয় বর্তমানে পুরপ্রশাসকমণ্ডলীর হাতে পুরসভা পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া রয়েছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রাজ্যের অন্য পুরসভাগুলির সঙ্গে রঘুনাথপুরেও পুর-ভোট করানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তাই বিধানসভা ভোটের নিরিখে শহরের মন কোনও দলের দিকে, তা নিয়ে চর্চা চলছে বিভিন্ন মহলে।
লোকসভা ভোটে রঘুনাথপুর পুরশহরের ১৩টি ওয়ার্ডের সব ক’টিতেই বিজেপির থেকে পিছিয়ে পড়েছিল তৃণমূল। বিধানসভা ভোটে নিজেদের ‘হারানো জমি’ কিছুটা হলেও উদ্ধার করেছে বলে দাবি করছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। দাবির পক্ষে তাঁরা সামনে আনছেন, প্রথমত, লোকসভার তুলনায় বিধানসভা ভোটে পুর-শহরে দলের সার্বিক প্রাপ্ত ভোট বৃদ্ধি। দ্বিতীয়ত, দু’টি ওয়ার্ডে বিজেপির থেকে ভোটে এগিয়ে থাকার ঘটনা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিধানসভা ভোটের নিরিখে রঘুনাথপুরে ২ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে এগিয়ে আছে তৃণমূল। এ ছাড়া, যেখানে লোকসভা ভোটে তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৪,৬০৭, বিধানসভা ভোট তা বেড়ে হয়েছে ৬,১৮৯। লোকসভার তুলনায় এই শহরে বিজেপি সঙ্গে ভোটের ব্যবধানও অর্ধেকের কাছাকাছি কমিয়ে এনেছে রাজ্যর শাসকদল।
আবার ওয়ার্ড-ভিত্তিক পরিসংখ্যান দেখিয়ে বিজেপি নেতৃত্ব দাবি করছেন, তাঁরাই পুরসভার ক্ষমতা পাবেন। পরিসংখ্যান ঘেঁটে জানা যাচ্ছে, তৃণমূল পিছিয়ে রয়েছে প্রাক্তন পুরপ্রধান তথা বর্তমান পুরপ্রশাসক মদন বরাটের ওয়ার্ডে। একই ভাবে প্রাক্তন উপপুরপ্রধান তরণী বাউরির ওয়ার্ডেও পিছিয়ে আছে তৃণমূল। দলের শহর কমিটির সভাপতি বিষ্ণুচরণ মেহেতার ওয়ার্ডেও পিছিয়ে গিয়েছে তৃণমূল।
রঘুনাথপুর বিধানসভায় বিজেপির জয়ের নেপথ্যে রয়েছে রঘুনাথপুর পুরসভা ও রঘুনাথপুর ১ ব্লকের ভোটপ্রাপ্তি। এই বিধানসভা কেন্দ্র পাঁচ হাজারের কিছু বেশি ভোটে জিতেছেন বিজেপি প্রার্থী বিবেকানন্দ বাউরি। হিসেবে দেখা যাচ্ছে, তাঁকে প্রায় আড়াই হাজার ভোটের ‘লিড’ দিয়েছে রঘুনাথপুর শহরই।
বিজেপির নেতাদের একাংশ মানছেন, নিতুড়িয়া ব্লকে সামান্য ব্যবধানে তাঁদের প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও, সাঁতুড়ি ব্লকে প্রচুর ভোটে তৃণমূল প্রার্থীর তুলনায় পিছিয়ে যেতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই ঘাটতি মিটিয়ে বিজেপি প্রার্থীকে জয় এনে দেয় রঘুনাথপুর পুরসভা ও রঘুনাথপুর ১ ব্লকে ভোটের ‘লিড’। তাই লোকসভা ভোটের তুলনায় বিধানসভা ভোটে তাঁদের ভোট কমলেও রঘুনাথপর শহরের ফল মোটের উপরে আশাপ্রদ হয়েছে বলেই দাবি করছেন বিজেপি নেতৃত্ব।
বিজেপির রঘুনাথপুর শহর মণ্ডল সভাপতি স্বপ্নেশ দাস বলেন, ‘‘লোকসভা ও বিধানসভা ভোটের প্রেক্ষাপট সব সময়েই আলাদা। তবুও রঘুনাথপুর শহরে ১১টি ওয়ার্ডেই এগিয়ে আছি আমরা। তবে ভোট কেন কমল, তা দলীয় স্তরে অবশ্যই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’’
তৃণমূলের অন্দরের দাবি, পুর-পরিষেবা নিয়ে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে থাকতে পারে ইভিএমে। দলীয় বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, শহরের অধিকাংশ ওয়ার্ডেই রাস্তাঘাট ও পানীয় জলের সমস্যা রয়েছে। তা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে পুরবাসীর মধ্যে। তৃণমূলের শহর কমিটির সভাপতি বিষ্ণুচরণ মেহেতাও বলছেন, ‘‘রাস্তাঘাটের সংস্কার ও পুরসভার নিজস্ব জলপ্রকল্প তৈরি করতে পারলে, ভোটের ফল দেখে আফশোস করতে হত না।” সে সবের সঙ্গেই দলের শহরের কিছু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতের অভিযোগে সরব হয়েছেন রঘুনাথপুরের তৃণমূল প্রার্থী তথা দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক হাজারি বাউরি।
তবে পুরসভার তরফে দাবি করা হচ্ছে, লোকসভা ভোটের পরেই রাস্তাঘাট ও পানীয় জলের প্রকল্প তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু পরে করোনা পরিস্থিতি ও লকডাউনের কারণে রাজ্য থেকে অর্থ পুরসভা পায়নি বলেই, পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করা যায়নি। তবে সবাইকে এককাট্টা করে পুরভোটের আগেই ওই সব ক্ষত মেরামত করার চেষ্টা হবে বলে দাবি করেছেন শহর তৃণমূল নেতৃত্ব।