Advertisement
E-Paper

এত আগে কেন এল মেয়ে, কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বৃদ্ধ

চোখের জল কিছুতেই বাঁধ মানছে না ষাটোর্ধ্ব সুভাষচন্দ্র ঘোষের। মানবেই বা কী করে? রবিবারের এক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে তাঁর স্ত্রী, ছেলে, মেয়েকে। প্রাণ হারিয়েছেন ভাইপোর স্ত্রী-ও।

স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০১৫ ০১:১৪
দুর্ঘটনার চিহ্ন এখনও টাটকা রাস্তায়। (ডান দিকে), শোকস্তব্ধ সুভাষচন্দ্র ঘোষ। ছবি: শুভ্র মিত্র।

দুর্ঘটনার চিহ্ন এখনও টাটকা রাস্তায়। (ডান দিকে), শোকস্তব্ধ সুভাষচন্দ্র ঘোষ। ছবি: শুভ্র মিত্র।

চোখের জল কিছুতেই বাঁধ মানছে না ষাটোর্ধ্ব সুভাষচন্দ্র ঘোষের। মানবেই বা কী করে? রবিবারের এক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে তাঁর স্ত্রী, ছেলে, মেয়েকে। প্রাণ হারিয়েছেন ভাইপোর স্ত্রী-ও। এক লহমায় সব হারিয়ে শোকে পাথর বিষ্ণুপুর থানার রাধানগর গ্রামের বাসিন্দা সুভাষবাবু।

সোমবার নিজের বাড়ির দাওয়ায় বসে চোখের জল মুছে বলছিলেন, ‘‘প্রতি বছর জামাই ও নাতিকে সঙ্গে নিয়ে বিলাসপুর থেকে ভাইফোঁটা দিতে আসে মেয়ে। জানিয়েছিল, কালীপুজোর দু’দিন আগে আসবে। ওই সময় ট্রেনের রিজার্ভেশন না পাওয়ায় অনেকটা আগেই এসে গিয়েছিল ওরা। হাতে সময় পাওয়ায় জয়রামবাটি মাতৃমন্দির দর্শন ছিল ওদের বাসনা। সেই মতো মা, দাদা, আমার ভাইপোর স্ত্রী আর ওদের মেয়েদের নিয়ে সকালেই বেরিয়েছিল মেয়ে। বারোটার সময় ঠাকুরের প্রসাদ খেয়ে স্ত্রীর শেষ ফোন—‘আমরা বেরোচ্ছি। সাড়ে তিনটে-চারটের মধ্যে পৌঁছে যাবো। এক সের চাল বসিয়ে দাও’। সেই চাল যখন ফুটল, লোকমুখে জানতে পারলাম ওরা আর নেই!”

মাতৃমন্দির ঘুরে রবিবার দুপুরে বাড়ি ফিরছিলেন সুভাষবাবুর স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও নাতনিরা। আড়াইটে নাগাদ বিষ্ণুপুর-সোনামুখী রাস্তায়, ভাটরা গ্রামের কাছে দ্বারকেশ্বর নদের সারদা সেতু থেকে নেমে বাঁক নেওয়ার সময় একটি খালি ডাম্পারের মুখোমুখি পড়ে যায় ওই গাড়িটি। দুর্ঘটনায় মারা যান ওই গাড়ির পাঁচ আরোহী। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন সুভাষবাবুর স্ত্রী রেবা ঘোষ (৬০), ছেলে চঞ্চল ঘোষ (৩৫), মেয়ে সোমা সরখেল (৩০) এবং ভাইপোর স্ত্রী শিবানী ঘোষ (৩৮)। মৃত্যু হয় গাড়িটির চালক আনন্দ মণ্ডলেরও (২৮)। আনন্দ নিজেও রাধানগর গ্রামেরই বাসিন্দা। আশঙ্কাজনক অবস্থায় চঞ্চলের স্ত্রী মানসী ও ভগ্নিপতি বসন্ত সরখেলকে বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। বিষ্ণুপুর জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চঞ্চলের মেয়ে ইপ্সিতা, বসন্তের ছেলে অনুরাগ এবং শিবানীর দুই মেয়ে শিল্পী ও পায়েল।

Advertisement

পাঁচ জনকে হারিয়ে শোকে পাথর গোটা গ্রাম। এ দিন সুভাষবাবুর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীদের ভিড়। সকালেই বাড়িতে এসে সমবেদনা জানিয়ে গিয়েছেন রাজ্যের মন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। দুপুরে ঘুরে যান বিজেপি-র রাজ্য কমিটির সহ সভাপতি সুভাষ সরকার। রবিবার থেকেই এই শোকসন্তপ্ত পরিবারটির পাশে আছেন বিষ্ণুপুরের প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক স্বপন ঘোষ। সুভাষবাবুর সম্পর্কিত আত্মীয়ও তিনি। স্বপনবাবু বললেন, “রাতেই ময়নাতদন্তের পর হাসপাতাল থেকে দেহগুলি গ্রামের শ্মশানে এনে রাখা আছে। সুভাষবাবুর ছোট ছেলে, সিআরপি জওয়ান শুভেন্দু অসমের ডিব্রুগড় থেকে ফিরলেই দাহ কাজ শুরু করা হবে।’’ তিনি জানান, সুভাষবাবুর বড় ছেলে চঞ্চলও ছিলেন সিআরপি-র ১৬৯ ব্যাটেলিয়নের জওয়ান। তিনি পুরুলিয়ার বান্দোয়ানে কর্মরত ছিলেন। তাঁর পরিবার থাকে দুর্গাপুরে।

সুভাষবাবুর বাড়ি লাগোয়া তাঁর ভাইপো তারাশঙ্করের বাড়ি। সেখানেও আত্মীয়-বন্ধুদের ভিড়। ওই দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন তারাশঙ্করের স্ত্রী শিবানী। দুই মেয়ে বিষ্ণুপুর হাসপাতালে। এ দিন তারাশঙ্কর বলছিলেন, “কাকিমা বললেন, পুজো দিতে যাচ্ছি। কিন্তু একী হয়ে গেল!” চঞ্চলের স্ত্রী মানসীদেবীকে পরে সিআরপি-র তরফে বাঁকুড়া মেডিক্যাল থেকে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।

এ দিন দুপুরেই বাঁকুড়া মেডিক্যালে দাদা বসন্ত ও ভাইপো অনুরাগকে দেখে রাধানগরে সুভাষবাবুর বাড়িতে আসেন বসন্তের মেজো ভাই কানাই সরখেল। তাঁকে দেখে ফের কান্নায় ভেঙে পড়েন প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকতা থেকে সদ্য অবসর নেওয়া সুভাষবাবু। তখনও বলে চলেছেন, ‘ওরা যদি কালী পুজোর দু’দিন আগেই আসতো, এই ঘুরতে যাওয়ার কথাটা মাথায় আসতো না কারও!’ বউদি রেবা, ভাইপো চঞ্চল ও ভাইজি সোমার মৃত্যুর খবর পেয়ে পাশের ওন্দা থানার বনমালীপুর গ্রাম থেকে এসেছেন সুভাষবাবুর বোন আরতি দত্ত। দাদাকে তিনি-ই সামলাচ্ছিলেন।

ছবিটা আলাদা নয় আনন্দ মণ্ডলের বাড়িতেও। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে গাড়ি চালক আনন্দ। বাবা জগন্নাথবাবু বলছিলেন, “উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে বছর দুয়েক আগে ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে গাড়ি কিনে চালাচ্ছিল। বিয়ের কথাও শুরু হয়েছিল। এ ভাবে কপাল পুড়ল আমার!” ঘরের ভিতরে কাঁদছিলেন মা আঙ্গুরবালাদেবী। কোনও রকমে বললেন, “সকালে চা খেয়ে বেরিয়েছিল ছেলে। তখনও ভাবিনি এটাই ওর শেষ যাওয়া।’’ বাড়ির বাইরে চোখে জল আনন্দের বন্ধু পেশায় সিভিক ভলান্টিয়ার সোমেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বললেন, “অসম্ভব ভাল গাড়ি চালাত বলে সরকারি কাজেও আনন্দকে ডাকা হত। তাকেই কিনা এ ভাবে মরতে হল !’’

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জন্য ভাটরা গ্রামের কাছে রাস্তার ওই বাঁকে গাছপালা এবং ঝোপঝাড় পরিষ্কার না হওয়াকেই দূষছেন গ্রামবাসীরা। এ দিনও দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেল, গাছের ডালপালা এখনও রাস্তার দিকে এলিয়ে। সরকারি ভাবে ডালপালা কাটার ব্যাপারে পদক্ষেপই করা হয়নি। বিজেপি নেতা সুভাষবাবু বলেন, “রাস্তায় উঠে আসা গাছপালা অবশ্যই কাটা উচিত। সেই সঙ্গে জরুরি, ওখানে ২০০ মিটারের একটি বাইলেনের। এর জন্য বিরাট কিছু খরচ নেই।’’ বাঁকুড়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি অরূপ চক্রবর্তী এ দিনও বলেছেন, “পূর্ত দফতরকে দ্রুত ওই কাজে হাত দিতে বলেছি।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy