Advertisement
E-Paper

দুই তৃণমূলের লড়াইয়ে পিষছে স্কুল পড়ুয়ারাই

অনুব্রতর তৃণমূল’ বনাম ‘কাজলের তৃণমূল’! আর তারই জাঁতাকলে সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে নানুর বিধানসভা কেন্দ্র এলাকার ছোট ছোট স্কুলপড়ুয়ারা। দুরু দুরু বুকে যেতে হচ্ছে মাধ্যমিকের পরীক্ষাকেন্দ্রে। দুষ্কৃতীরা দিনের পর দিন অবাধে বোমা-গুলির লড়াই চালালেও নীরব পুলিশ-প্রশাসন। এমন এক সন্ত্রাসের আবহেই ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল বোলপুরের সিঙ্গি পঞ্চায়েত।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০২:১৯
শুক্রবার নাহিনায় গুলিবিদ্ধ তৃণমূল কর্মীর বিপর্যস্ত পরিবার।ছবি: বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী।

শুক্রবার নাহিনায় গুলিবিদ্ধ তৃণমূল কর্মীর বিপর্যস্ত পরিবার।ছবি: বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী।

‘অনুব্রতর তৃণমূল’ বনাম ‘কাজলের তৃণমূল’!

আর তারই জাঁতাকলে সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে নানুর বিধানসভা কেন্দ্র এলাকার ছোট ছোট স্কুলপড়ুয়ারা। দুরু দুরু বুকে যেতে হচ্ছে মাধ্যমিকের পরীক্ষাকেন্দ্রে। দুষ্কৃতীরা দিনের পর দিন অবাধে বোমা-গুলির লড়াই চালালেও নীরব পুলিশ-প্রশাসন। এমন এক সন্ত্রাসের আবহেই ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল বোলপুরের সিঙ্গি পঞ্চায়েত। এ বার গুলিবিদ্ধ জেলা তৃণমূল সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলের স্নেহধন্য তথা নানুরের তৃণমূল বিধায়ক গদাধর হাজরার এক অনুগামী। অভিযোগের তির সেই নানুরের আর এক তৃণমূল নেতা কাজল শেখ গোষ্ঠীর দিকেই।

শুক্রবার পৌনে ১২টা নাগাদ বোলপুরের নাহিনা গ্রামের ঘটনা। পরিবারের দাবি, কাজল-গোষ্ঠীর অত্যাচারে দীর্ঘ দিন ধরে গ্রামছাড়া ছিলেন তৃণমূল কর্মী রফিকুল মোল্লা। আড়াই বছর পরে সম্প্রতি বিধায়কের আশ্বাসে তিনি গ্রামে ফিরেছিলেন। তাঁর দাদা শফিকুল মোল্লা এ দিন খেতে সাব-মার্সিবলে জল দেওয়া দেখতে যাচ্ছিলেন। সেই সময়ে তিনটি মোটরবাইকে নয় জন দুষ্কৃতী এসে শফিকুলকে রফিকুল ভেবে গুলি চালিয়ে চম্পট দেয় বলে অভিযোগ। শফিকুলকে প্রথমে বোলপুর মহকুমা হাসপাতাল ও পরে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর বুকের ডান দিকে একটি গুলি লেগেছে। এ দিন হাসপাতাল চত্বরে দাঁড়িয়ে রফিকুল দাবি করেন, ‘‘আমি শুরু থেকেই অনুব্রতর তৃণমূল করি। বিধায়ক গদাধর হাজরার অনুগামী। সে কারণেই কাজলের তৃণমূলের লোকেরা আমাকে নানা ভাবে চাপ দিত। ওদের অত্যাচারেই গ্রামছাড়া ছিলাম। ফিরতেই এই ঘটনা ঘটে গেল!’’

এ দিন দুপুর দেড়টা নাগাদ নাহিনায় গিয়ে দেখা গেল পুলিশি টহলদারি শুরু হয়েছে। গোটা গ্রাম থমথমে হয়ে রয়েছে। আতঙ্কের সুরেই গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বললেন, ‘‘এলাকা দখল নিয়ে দু’পক্ষ লড়ছে আর ভুগছি আমরা। যখন কিছু ঘটে তখন পুলিশ হাজির হয়। আবার পুলিশ ফিরে গেলেই লড়াই লেগে যায়। জানি না কবে এই সংঘর্ষ থামবে।’’ দুই তৃণমূলের লড়াইয়ের মাঝে যে কোনও দিন বেঘোরে প্রাণ দিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকার অনেকেই। নাহিনা এবং লাগোয়া এলাকার প্রায় ৫০টি পরিবারের ছেলেমেয়ে এ বার মাধ্যমিকে বসেছে। সিট পড়েছে স্থানীয় বাহিরী ব্রজসুন্দরী হাইস্কুলে। রোজ চাপা আতঙ্ক নিয়েই পরীক্ষা দিচ্ছেন ওই পড়ুয়ারা। এ দিন ইতিহাস পরীক্ষা দিয়ে ওই কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়েই আকলিমা খাতুন, তকলিমা খাতুন, আমিরুল ইসলাম, শেখ গিয়াসুদ্দিনরা বলে, ‘‘বাড়ি থেকে বেরোনোর পরেই আজকের ঘটনাটি ঘটেছে বলে কোনও আঁচ পাইনি। কিন্তু এখন বাড়ি ফেরার পথে কী হবে, ভাবতে পারছি না। এ ক’দিনের গোলাগুলির জেরে সব সময়ে আতঙ্কে থাকি। পড়ায় ঠিকস করে মনও বসাতে পারিনি।’’

যদিও মাধ্যমিক শুরু আগেই আশঙ্কার কথা জানিয়ে এলাকার পরীক্ষার্থীরা চিঠি দিয়ে দ্বারস্থ হয়েছিলেন এসডিপিও-র (বোলপুর)। কিন্তু তার পরেও পরিস্থিতির কোনও হেরফের হয়নি। কখন কী ঘটে যায়— আতঙ্ক আর আশঙ্কার মধ্যে দিয়েই জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষাটা দিতে হচ্ছে নানুর-বোলপুর এলাকার একটা বড় অংশের পরীক্ষার্থীদের। এলাকার সাম্প্রতিক সংঘর্ষে এখনও পর্যন্ত কোনও মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর উপরে কিছু না ঘটেনি। তবে এলাকাবাসীই মনে করিয়ে দিচ্ছেন বাহিরীর পঞ্চাম শ্রেণির ছাত্র কবিরুল খানের কথা। দিন কয়েক আগে দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষের দিন স্কুল থেকে ফেরার পথে বোমার আঘাতে গুরুতর জখম হয়েছিল কবিরুল। কোনও রকমে প্রাণে বেঁচে গেলেও শরীরের বিভিন্ন অংশে সে চোট পেয়েছে। একটি চোখে ওই ছোট্ট ছেলেটি ফের দেখতে পাবে কিনা, তা নিয়ে দুশ্চিন্তাও শুরু হয়েছে। নাহিনার এক অভিভাবক বলছেন, ‘‘এই রকম পরিস্থিতি দেখে অনেকেই ছেলেমেয়েদের অন্যত্র আত্মীয়ের বাড়িতে রেখে এসেছেন। সেখান থেকেই পড়ুয়ারা পরীক্ষাকেন্দ্রে আসছেন। যাঁদের কাছাকাছি আত্মীয় নেই, তাদের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।’’

এ দিকে, গদাধর এ দিন জানিয়েছেন, গুলিবিদ্ধ যুবক তাঁদের দলীয় কর্মী। এলাকা দখলের জন্য কাজলের লোকেরাই এ দিন গুলি চালিয়েছে তাঁর অভিযোগ। কাজল অবশ্য ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বরং দাবি, ‘‘ওই গ্রাম বর্তমানে নানুরের বিধায়কের অনুগামীদের দখলে রয়েছে। যাঁদের বিরুদ্ধে উভিযোগ তোলা হচ্ছে, তাঁরাই দীর্ঘ দিন ধরে গ্রামছাড়া। আসলে বিধায়ক ওই গ্রামের দখল ধরে রাখতে বহিরাগত কিছু দুষ্কৃতী ভাড়া করে এনেছেন। ওই দলেই এ দিনের গুলিবিদ্ধ যুবক ছিলেন। অসাবধানে নাড়াচাড়া করতে গিয়ে নিজেদের বন্দুকেই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।’’ পুলিশ যদিও জানিয়েছে, ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনও অভিযোগ দায়ের হয়নি। তবে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী, অভিভাবকেরা নির্বিঘ্নে যাতায়াতের জন্য এলাকায় চারটি পুলিশের গাড়ি ঘোরাফেরা করছে বলেও তাদের দাবি। ওই ঘটনায় রাতে সিউড়ি থেকে খোকন শেখ নামে এক কাজল অনুগামীকে ধরেছে পুলিশ।

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রামচন্দ্র ডোমও। তাঁর প্রতিক্রিয়া, ‘‘তৃণমূলের গোষ্ঠী সংঘর্ষের জেরে স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। এ ব্যাপারে পুলিশ তার দায় কোনও ভাবেই এড়িয়ে যেতে পারে না। পুলিশ-প্রশাসনের কাছে বারবার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছি। তার পরেও পুলিশ সক্রিয় হয়নি।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy