সাসপেন্ড হয়েছেন একটি ছোট পঞ্চায়েত এলাকার তিন তৃণমূল কর্মী। কিন্তু, শাসক দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ বীরভূমে এই ঘটনা আরও বড় কোনও বার্তা বহন করছে বলেই মনে করছে জেলার রাজনৈতিক মহল। কারণ, নলহাটি ২ ব্লকের বারা ২ গ্রাম পঞ্চায়েতের সুকরাবাদ এলাকার ওই তিন সক্রিয় তৃণমূল কর্মী শাস্তি পেয়েছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে ইন্ধন জোগানোর দায়েই।
দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে দলের জেলা সভাপতির নির্দেশে ওই তিন কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তৃণমূলের নলহাটি ২ ব্লক সভাপতি বিভাস অধিকারী। বৃহস্পতিবার ওই তিন কর্মীকে চিঠি দিয়ে বহিষ্কারের কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই তিন কর্মী হলেন, প্রাক্তন অঞ্চল সভাপতি ইমাজউদ্দিন সেখ এবং অঞ্চল কমিটির দুই সদস্য আব্দুল তোহাব ও হাসিবুল সেখ। বিভাসবাবু বলেন, ‘‘জেলা সভাপতিকে জানান হয়। তিনি ওই তিন কর্মীকে বহিষ্কারের নির্দেশ দেন।’’
বিভাসবাবু জানান, নলহাটি ২ ব্লকে তৃণমূলের যখন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই সময় ওই তিন তৃণমূল কর্মী বিরোধী সিপিএম ও কংগ্রেস কর্মীদের নিয়ে এলাকায় দলবিরোধী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত থেকে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। গত ১৭ জানুয়ারি সুকরাবাদ গ্রামে এলাকার তৃণমূল কর্মীদের নিয়ে দলের বিধায়ক অসিত মাল সভা ডেকেছিলেন। কিন্তু ওই তিন কর্মী দলীয় সভায় উপস্থিত না থেকে ওই গ্রামেই পাল্টা সভা করেছিলেন। ব্লক তৃণমূল সূত্রে খবর, ওই সভায় সিপিএম ও কংগ্রেস কর্মীদের নিয়ে তাঁদেরকে ভুরিভোজ খাইয়ে লোক জমায়েত করেছিলেন। এবং সভায় দলীয় পতাকার মর্যাদা হানি করেছিল ওই তৃণমূল কর্মীরা।
এই জেলায় গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব নতুন নয়। সিউড়ি, রামপুরহাট এবং বোলপুর মহকুমায় শাসকদলের কর্মী-সমর্থকরা সারা বছরই নিজেদের মধ্যে গোষ্ঠী কোন্দলে মেতে থাকে। গত চার বছরে সেই দ্বন্দ্ব কোনও অংশেই কমেনি। বরং বহু ক্ষেত্রেই দলের বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বের বলি হয়েছে নিচুতলার কর্মীরাই। চার বছরে জেলায় খুন হওয়া তৃণমূল নেতা-কর্মীর সংখ্যা কবেই দুই অঙ্ক ছাড়িয়েছে। দুবরাজপুরে জোড়া খুন থেকে দুই প্রাক্তন ব্লক সভাপতি অশোক ঘোষ এবং অশোক মুখোপাধ্যায়— সব ক্ষেত্রে নিশানায় শাসকদলেরই নিজেদের কোন্দল। তবে, বর্তমানে জেলা তৃণমূল নেতৃত্বকে সব থেকে বেশি বেগ দিচ্ছে নানুর এলাকা। যেখানে কেতুগ্রামের তৃণমূল বিধায়ক শেখ সাহানেওয়াজের ভাই কাজল শেখ এবং অনুব্রত ঘনিষ্ঠ স্থানীয় বিধায়ক গদাধর হাজরার বিরোধ প্রায় চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে। তার জেরে খোদ কাজলের উপরেই হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ। আর তার পর পরই বোলপুর এলাকায় খুন হয়ে যান গদাধর অনুগামী তিন তৃণমূল কর্মী। অথচ তার কিছু দিন আগেই শহিদ দিবসের মঞ্চে দলনেত্রীর বার্তা পেয়ে সমস্ত দ্বন্দ্ব ‘মিটিয়ে’ বোলপুর কার্যালয়ে এসে অনুব্রতর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন কাজল। আর তারই জেরে এ দিনই বৈঠক শেষে অনুব্রতকে এমনও বলতে হয়েছে, ওই এলাকায় গদাধরই ফের প্রার্থী হবেন। দলনেত্রী ছাড়া সেই সিদ্ধান্ত কেউ পাল্টাতে পারবেন না। অনুব্রত মুখে যা-ই বলুন না কেন, জেলায় শাসকদলের বিভিন্ন স্তরে যে নানা দ্বন্দ্ব এখনও বহাল, তা আড়ালে মানছেন বহু নেতা-কর্মীই। কোন্দলের খবর ছিল রামপুরহাটেও।
দিন কয়েক আগেই সে জন্য খোদ দলনেত্রীকেই কালিঘাটে ডেকে ক্লাস নিতে হয়েছে। তারপরও যে দলে যে কোন্দল জারি রয়েছে, বহিষ্কারের ঘটনায় তার প্রমাণ মিলল। দল থেকে বহিষ্কারের চিঠি পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে, এ দিন অবশ্য ইমতিয়াজ সেখ জানান, ‘‘আমি প্রথম থেকে এখানে গিয়াস মাস্টারের নেতৃত্বে তৃণমূল করে আসছি। অথচ তৃণমূলের সভা গ্রামে হবে আমাকে কেউ জানায়নি। সেই জন্য আমরা আলাদা ভাবে নিজেদের মধ্যে খাওয়া দাওয়া করে নিজেদের মতো করে আলোচনায় বসেছিলাম। তাতে কারও খারাপ লাগতে পারে। তবে এখনও আমি বহিষ্কারের চিঠি পাইনি।’’ ইমতিয়াজ সেখের দাবি, নলহাটি ২ ব্লকে দলের সংগঠন কম রয়েছে। অথচ এখানে দলের কর্মীরা কেউ যদি বিভাসের সঙ্গে কথা বলে তার খারাপ লাগছে আবার কেউ যদি রাণা, গিয়াস মাস্টারের সঙ্গে মিশছে সেখানেও বিপদ। কেউ যদি প্রাক্তন ব্লক সভাপতি স্বপনের সঙ্গে কথা বলছে, সেখানেও নিজেদের মধ্যে বিবাদ লাগছে।
দলের জেলা কমিটির সদস্য মহম্মদ গিয়াসউদ্দিন বলেন, ‘‘ইমতিয়াজ সেখের মধ্যে ক্ষোভ ছিল বলে জানি। তবে তাঁকে বহিষ্কার কে করেছে কেনই বা করেছে সে ব্যাপারে জানা নেই।’’