জেলা জুড়ে গণ-ভাইফোঁটার রেওয়াজ অনেক দিন থেকেই আছে। তবে মহম্মদবাজার থানার পটেলনগরের প্রত্যাবর্তন ক্লাব এবার একটি অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে। ক্লাবটিতে এ বার প্রথম কালীপুজো হয়েছে। সেই বাজেট থেকে টাকা বাঁচিয়ে আর সদস্যদের থেকে কিছু বাড়তি চাঁদা আদায় করে তাঁরা এলাকার আদিবাসী ছেলে-মেয়েদের ভাইফোঁটা দিলেন। অনুষ্ঠানটি হয় পটেলনগরের এসআই অফিস ও বেসিক ট্রেনিং কলেজ সংলগ্ন মাঠে। আচার মেনে চন্দন, ধান, দূর্বা দিয়ে শাঁখ বাজিয়ে ফোঁটা দেওয়া হয়। ভাই-বোনেদের জন্য ছিল মিষ্টি, কলা এবং জিলিপির বন্দোবস্ত। সকাল সাড়ে ১১টার সময় আরম্ভ হয় অনুষ্ঠান। কালীপুজোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি মঞ্চেই সার দিয়ে বসে পরে ভাইরা। তাদের কেউ ক্লাস ওয়ানে প়ড়ে, কেউ স্কুলেই যায় না, কেউ আবার ক্রাশারে কাজ করে। বোনেরাও সবাই ক্লাস ওয়ান বা টু। ভাইদের সামনে মিষ্টির থালা রেখে বোনরা বসে। মাইকে বাজে ভাইফোঁটার ছড়া ‘ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা/ যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা/ যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা/ আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা’। ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে কাজে হাত লাগান এলাকার লোকেরাও।
ভাইরা শুধু ফোঁটা পাবে, আর বোনেরা বাদ? তা তো আর হতে পারে না। অনুষ্ঠান শেষ হতেই ক্লাবের সদস্যরা বোনেদেরও বসিয়ে দেন ভাইদের পাশে। তাদের কপালে ফোঁটা দিয়ে হাতে তুলে দেন মিষ্টির থালা। সঙ্গে পেন, খেলনা, বেলুন, সাজগোজের জিনিস-সহ নানা উপহার। খাওয়া শেষ করে উপহার নিয়ে যে যার বাড়ির পথে হাঁটা দেয়।
ক্লাবের সম্পাদক প্রণব দে এবং সদস্য অভিজিৎ ব্যানার্জী, শান্তনু বিশ্বাসরা জানালেন, ‘‘পুজোতে লাইট, মাইক আর প্যান্ডেলে অনেক খরচ হয়। কিন্তু সে কথা ক’জন মনে রাখে? আমরা অন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম। তাই এলাকার আদিবাসী ভাইবোনেদের নিয়ে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন।’’
ফোঁটা দিতে এসেছিল ক্লাস ফাইভের নার্গিস পারভিন, ক্লাস ওয়ানের বনি বাস্কি, উর্মিলা টুডুরা। আর ফোঁটা নিতে শ্যামল টুডু, শ্রাবণ টুডু বা ক্রাশারে কাজ করা রাজু কর্মকারের মতো অনেকে। সকলেই খুব খুশি। জানাল, এ রকম আনন্দ কোনও দিন হয়নি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত এলাকার গদাধর চৌধুরী, তপন পাল, অরিজিৎ বন্দোপাধ্যায়রা প্রতিশ্রুতি দিলেন, এই ধরনের কাজকর্মে ক্লাবের পাশে সব সময় পাশে থাকবেন।
ভাইফোঁটা উপলক্ষে ভাইকে ফোঁটা দিতে বাবার বাড়ি এসেছিলেন রেখা কর এবং কবিতা মিত্র সরকার। ক্লাবে ছোট ছোট বোনেদের ফোঁটা দিতে সাহায্য করছিলেন তাঁরা। বললেন, ‘‘প্রতি বারই তো নিজের ভাইকে ফোঁটা দিই। এ বার একসঙ্গে এত ভাই পেয়ে গেলাম।’’
অন্য দিকে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ ভুলে সকলে বসলেন এক সারিতে। সৌজন্যে সেই গণ-ভাইফোঁটা। শুক্রবার এমন ছবি দেখা গেল বোলপুর, শান্তিনিকেতন ও ইলামবাজারের একাধিক জায়গায়। উদ্যোক্তাদের দাবি, অনুষ্ঠান হয়েছে রীতি মেনেই।
এ দিন সকালে বোলপুরের জামবুনির বাসিন্দা হরিপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় নিজের বাড়ির সামনে গণ-ভাইফোঁটার আয়োজন করেন। বিগত বারো বছর ধরে তিনি এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছেন। তিনি দাবি করেন, ‘সকল সম্প্রদায়ের বঞ্চিত, অবহেলিত শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য এই উদ্যোগ’’। পাশাপাশি এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তাও ছড়িয়ে দিতে চান বলে জানান। স্থানীয় সূত্রে জানা গেল, হাতে গোনা কয়েক জনকে নিয়ে এই উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। এখন সেই সংখ্যাটা প্রায় দু’শোর কাছাকাছি পৌঁছেছে। এ বারের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মকরমপুর গৌড়ীয় আশ্রমের কেশব স্বামী, বোলপুরের বণিক সভার মুরশেদ নেওয়াজ খান, উপ-পুরপ্রধান নরেশ বাউড়ি, বোলপুর থানার আইসি প্রবীর দত্ত প্রমুখ। প্রায় শতাধিক শিশুকে এ দিন ফোঁটা দেওয়া হয়।
একই ভাবে গণ ভাইফোঁটার আয়োজন করা হয়েছিল জামবুনির মাগা মায়ের মন্দিরেও। অন্য দিকে শান্তিনিকেতনের পূর্বপল্লি এলাকায় খুদে পড়ুয়াদের ফোঁটা, ফুল এবং চকোলেট দেওয়া হয়। এই অনুষ্ঠানটির উদ্যোক্তা বোলপুরের এসডিপিও অম্লানকুসুম ঘোষ এবং সিআই চন্দ্রশেখর দাস। পুলিশের তরফে দাবি করা হয়, জনসংযোগের পাশাপাশি পড়ুয়া এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করতে এ হেন উদ্যোগ।
ইলামবাজারে পথ-চলতি মানুষদের সেখানকার পরিমল স্মৃতি সঙ্ঘের উদ্যোগে স্থানীয় মহিলারা ফোঁটা দিয়ে মিষ্টিমুখ করান। উদ্যোক্তারা জানান, যে সমস্ত লোকেরা ভাইফোঁটা থেকে বঞ্চিত থাকেন তাঁদের কথা ভেবেই এই উদ্যোগ।