Advertisement
E-Paper

পথে রহস্য-মৃত্যু

বাড়ি ফেরার পথে ট্রেন থেকে মাকে ফোন করে রাতে ভাতের বদলে রুটি খেতে চেয়েছিল ছেলে। রুটি বানিয়ে ছেলের অপেক্ষাই সার হল মায়ের। রাতভর নিখোঁজ থাকার পরে ওই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর নিথর দেহ মিলল রেললাইনের ধারে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০২:৩৩

বাড়ি ফেরার পথে ট্রেন থেকে মাকে ফোন করে রাতে ভাতের বদলে রুটি খেতে চেয়েছিল ছেলে। রুটি বানিয়ে ছেলের অপেক্ষাই সার হল মায়ের। রাতভর নিখোঁজ থাকার পরে ওই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর নিথর দেহ মিলল রেললাইনের ধারে।

টিউশন থেকে ফেরার পথে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে বর্ধমান–সাহেবগঞ্জ লুপ লাইনে ওই মেধাবী ছাত্রের মৃত্যু ঘিরে রহস্য দানা বেঁধেছে রামপুরহাটে। রেল পুলিশ জানায়, মৃতের নাম জিষ্ণু মুখোপাধ্যায় (১৮)। বাড়ি রামপুরহাট থানার চাকপাড়া গ্রামে। রামপুরহাট হাইস্কুলের ওই ছাত্রের এ বার উচ্চ মাধ্যমিকে বসার কথা ছিল। ভোরের দিকে মল্লারপুর ও তারাপীঠ রোড স্টেশনের মাঝে জয়রামপুর সেতু সংলগ্ন এলাকায় আপ লাইনে ওই ছাত্রের দেহ উদ্ধার হয়। তাঁর কোমরের উপরের অংশ কাটা পড়েছিল। রেল পুলিশের দাবি, কোনও ভাবে ট্রেন থেকে পড়েই জিষ্ণুর মৃত্যু হয়েছে। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে শোকস্তব্ধ বাবা-মা। জিষ্ণুর অকাল মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমেছে গ্রামেও।

পরিবার সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার বিকালে সাঁইথিয়ায় অঙ্কের টিউশন নিতে গিয়েছিলেন জিষ্ণু। টিউশন শেষে সাঁইথিয়া থেকে রামপুরহাটগামী বিশ্বভারতী ফাস্ট প্যাসেঞ্জার ধরে তারাপীঠ রোড স্টেশনে নামতেন জিষ্ণু। রাত হয়ে যাওয়ায় স্টেশনেই ছেলের জন্য অপেক্ষা করতেন বাবা মলয় মুখোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গেই বাড়ি ফিরতেন জিষ্ণু। কিন্তু বৃহস্পতিবার টিউশনে ছুটি হতে দেরি হওয়ায় বর্ধমান–রামপুরহাট লোকাল ট্রেনে বাড়ি ফিরছিলেন জিষ্ণু। সেই হিসেবে রাত ১১টার মধ্যেই বাবার সঙ্গে তাঁর বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। যদিও রাত ৩টে পর্যন্ত জিষ্ণুর কোনও খোঁজ মিলছিল না।

Advertisement

মৃত ছাত্রের কাকা তাপস মুখোপাধ্যায় শুক্রবার জানান, সাঁইথিয়া স্টেশনে ট্রেনে চেপেই জিষ্ণু মোবাইল থেকে তাঁর মাকে ফোন করেছিলেন। রাতে ভাতের বদলে রুটি খাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে বলে তিনি মাকেও জানিয়েছিলেন। আরও এক বার গদাধরপুর স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ার পরে বাবাকে ফোনে জানিয়েছিলেন জিষ্ণু। সেই মতো মলয়বাবু ছেলেকে আনতে তারাপীঠ স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। জিষ্ণুর প্রতিবেশী এক দাদা সৌমেন চট্টোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘ট্রেন তারাপীঠ স্টেশন রোড ছেড়ে রামপুরহাটের দিকে চলে যাওয়ার পরেও ছেলেকে দেখতে না পেয়ে অবাক হন মলয়বাবু। কিন্তু, বারবার মোবাইল বেজে গেলেও তা ধরেনি জিষ্ণু।’’

এ দিকে, ঘণ্টাখানেক সেখানে অপেক্ষা করা পরেও ছেলের খোঁজ না পেয়ে রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন মলয়বাবু। রাত ১১টা থেকে বিভিন্ন স্টেশনের রেল কর্মীরা ওই ছাত্রের খোঁজে নেমে পড়েন। সাঁইথিয়া থেকে স্বাধীনপুর— লাগোয়া রেললাইনে তল্লাশি শুরু হয়। অন্য দিকে, রাত ৩টে নাগাদ রেলের লাইন নজরদারি দলের এক কর্মী পরীক্ষা চালানোর সময়ে স্থানীয় জয়রামপুর রেলসেতুর কাছে একটি মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে তারাপীঠ রোডের স্টেশন মাস্টারকে খবর দেন। সেখান থেকে খবর যায় রেল পুলিশে। লাইন ধরে এগিয়ে ভোর ৫টা নাগাদ জিষ্ণুর ট্রেনে কাটা মৃতদেহ উদ্ধার করে সাঁইথিয়া থানার রেল পুলিশ। তখনও ওই ছাত্রের পিঠে অঙ্কের বই খাতা ভর্তি ব্যাগটি ঝুলছিল। রেলের সাঁইথিয়া থানার ওসি বিকাশ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ওই লোকাল ট্রেন যাওয়ার পরেও লাইন দিয়ে বেশ কিছু ট্রেন গিয়েছে। কিন্তু, অন্ধকারে কোনও ট্রেনের চালক বা গার্ডই ওই ছাত্রের দেহটি দেখতে খেয়াল করতে পারেননি। পরে তারাপীঠ স্টেশনের এক কর্মীর নজরে তা আসে।’’

কী ভাবে ওই ছাত্র ট্রেন থেকে পড়ে গেল, তার অবশ্য কোনও উত্তর মিলছে না। এখনও পর্যন্ত ঘটনার কোনও প্রত্যদর্শীর সন্ধানও মেলেনি। ওই লোকাল ট্রেনের পিছনের দিকে গার্ডও ট্রেন থেকে কাউকে পড়ে যেতে দেখেননি বলে দাবি করেছেন। অন্য দিকে, ওই একই রাতে সাহেবগঞ্জ–বর্ধমান লুপ লাইনেই গদাধরপুর ও মল্লারপুর স্টেশনের মাঝে এক অজ্ঞাতপরিচয় প্রৌঢ়ের ট্রেনে কাটা দেহ উদ্ধার করেছে রেল পুলিশ। ফলে গোটা ঘটনায় জিষ্ণুর মৃত্যু ঘিরে রহস্য তৈরি হয়েছে। আপাতত অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে রেল পুলিশ। এ দিকে, একমাত্র ছেলের এই অকাল মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়েছেন বাবা ও মা মালাদেবী। এ দিন তাঁরা কেউ-ই ওই ঘটনা নিয়ে কোনও কথা বলতে চাননি। জিষ্ণুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক মহম্মদ নুরুজ্জামান বলেছেন, ‘‘জিষ্ণু পড়াশোনায় ভাল ছিল। নিয়মিত স্কুলেও আসত। উচ্চ মাধ্যমিকে ভাল ফল করবে বলেই আমরা আশা করেছিলাম। আমাদের স্কুল এক জন মেধাবী ছাত্রকে হারালো।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy