কলেজের ছাত্রীটির ছোট বেলার বান্ধবীর বিয়ে হয়েছিল দূরের একটি গ্রামে। বিয়ের পর থেকেই মেয়েটিকে অনবরত চাপ দেওয়া হচ্ছিল বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু তাঁর বাবা ঠিকা শ্রমিক। নিজেদেরই দিন গুজরান হয় না, মেয়ের শ্বশুরবা়ড়িতে দেবেন কী করে! ফলে উঠতে বসতে ওই বধূর কপালে জুটত খোঁটা। সকালের জলখাবারটুকুও পেতেন না। কোথায় অভিযোগ জানালে বিচার পাবেন জানতেন না ওই বধূ। এক সময় নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেন।
মেয়েদের উপর শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের এ রকম নানা ঘটনার কথা মন দিয়ে শুনলেন পুরুলিয়ার জেলা মহিলা সুরক্ষা আধিকারিক সুমা ঘোষ। মানবাজারের মানভূম কলেজের সম্প্রতি এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানেই উঠে আসে মেয়েদের দুর্দশার এই সব টুকরো ছবি।
কলেজের জাতীয় সেবা প্রকল্পের উদ্যোগে এই আলোচনাসভাটির আয়োজন করা হয়। বিষয়, ‘নারী অধিকার ও সচেতনতা’। সেই আলোচনাচক্রে যোগ দেন সুমাদেবী। তিনি বলেন, ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স অ্যাক্ট ২০০৫’ চালু হওয়ার পর থেকে মহিলাদের সুরক্ষায় আরও কড়া হয়েছে প্রশাসন। কিন্তু নিজেদের অধিকার এবং আইন সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় সেই সুবিধা নিপীড়িত মেয়েদের কাছে অনেক সময় পৌঁছয় না। এই ধরণের আলোচনা সভা সেই সমস্যার সমাধানে অনেকটাই কাজে আসে বলে তিনি জানান।
এ দিনের সভায় উঠে এসেছিল অন্য ছবির টুকরোও। এক ছাত্রী শোনালেন তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা। পাশের বাড়িতে থাকত তারই বয়সী একটি মেয়ে। তার বাবা জানিয়ে দিয়েছিলেন, ভাইয়ের বই কিনতে অনেক টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে। মেয়ের বইয়ের জন্য আর টাকা খরচ করতে পারবেন না। অনেক লড়াইয়ের পর একাদশ শ্রেণিতে উঠে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল মেধাবী মেয়েটি। পরে অন্য এক পড়শি পাশে দাঁড়ানোয় কলেজে ভর্তি হয়। সে দিন কোথায় গেলে, কাকে বললে সেই মেয়েটিকে সাহায্য করতে পারবেন সে কথা জানতেন না ছাত্রীটি। এ দিনের সভায় জানলেন।
মানভূম কলেজের সভাটিতে উপস্থিত ছিলেন জয়েন্ট বিডিও (মানবাজার ১) শ্রীকুমার ভট্টাচার্য এবং সিধো কানহো বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুদীপ গুঁই। এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন তাঁরাও। কলেজ সূত্রে জানানো হয়েছে, এই ধরণের আলোচনাসভা কলেজটিতে এই প্রথম হল। শুক্রবারের সভায় পড়ুয়ারা স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে আলোচনায় যোগ দিয়েছিল। তাদের মধ্যে অনেকেই সভা শেষ হওয়ার পর সুমাদেবীর ফোন নম্বর এবং ইমেইল আইডি চেয়ে নেয়। জেলা নারী সুরক্ষা আধিকারিকের আশা, ছাত্রীদের অধিকার বোধের প্রথম পাঠ সফল হয়েছে। সেখান থেকে বাকি সমাজেও ছড়িয়ে পড়বে সচেতনতা।