মঞ্চ বাঁধার কাজ প্রায়। ঘনঘন তদারকি করে যাচ্ছিলেন পুলিশ থেকে প্রশাসনের কর্তারা। ‘প্রশাসনিক সভা’ হবে বলে ঘোষণা করা হলেও মাঝে মধ্যে সাদা-সবুজ পাজামা-পাঞ্জাবী পরে মাঠ দর্শনে চলে আসছিলেন তাঁর দলের ছোট-বড়-মেজো-সেজো নেতারাও। কেউ কেউ জনপ্রতিনিধিও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আসছেন না। পরশু বৃহস্পতিবার বান্দোয়ানে প্রশাসনিক সভা করতে আসছেন না মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মঙ্গলবার দুপুরে তৃণমূল জেলা সভাপতি তথা মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতোর মুখ থেকে এই খবর শুনে ইস্তক মুষড়ে পড়েছেন দলের নেতা থেকে কর্মীরা। কারণ বাম আমলে মুখ্যমন্ত্রীরা বান্দোয়ানের আশপাশে সভা করে গেলেও মমতা মুখ্যম্ত্রী হয়ে এ দিকে আসেননি। বরং এই জেলার জঙ্গলমহল বলে পরিচিত বলরামপুর, বাঘমুণ্ডিতে তিনি গিয়েছেন। সভা করেছেন। রাত্রিবাসও করেছেন। কিন্তু বাঘমুণ্ডি নিয়ে তাঁর মুখে গত পাঁচবছরে তেমন কথা শোনা যায়নি বলে বিরোধীদের কটাক্ষ। কারণ এই বিধানসভা না কি সিপিএমের! যদিও তৃণমূল কর্মীরা বামেদের এই সব অভিযোগ আমল দিতে নারাজ। তাঁরা জানাচ্ছেন, মুখ্যমন্ত্রী ঠিক পরে আসবেন বান্দোয়ানে।
মঙ্গলবারই বান্দোয়ানে মুখ্যমন্ত্রী জন্য তৈরি হেলিপ্যাডে পরীক্ষামূলক ভাবে একটি হেলিকপ্টার নামে। দু’টি হেলিপ্যাড তৈরি হয়েছিল। জঙ্গলমহল বলে মুখ্যমন্ত্রীকে সড়কপথের তুলনায় হেলিকপ্টারে নিয়ে আসাতেই সায় ছিল পুলিশ মহলের। কিন্তু সেই হেলিকপ্টার যাত্রাই শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেল। প্রশাসনের একটি সূত্রে জানা যাচ্ছে, আকাশের মুখ ভার দেখেই হেলিকপ্টার ওড়ানোর সবুজ সঙ্কেত মিলছে না। পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রী শান্তিরামবাবু কলকাতা থেকে বান্দোয়ানে আসছিলেন এ দিন বেলায়। আসার পথেই তিনি সভা বাতিলের খবর পান। শান্তিরামবাবু বলেন, ‘‘তামিলনাড়ুতে প্রবল বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সেই নিম্নচাপ বাংলা-ঝাড়খণ্ডের দিকে সরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ওই আবহাওয়ায় মুখ্যমন্ত্রীর হেলিকপ্টার নামার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে।’’ আরও একটি কারণের কথাও শান্তিরামবাবু জানিয়েছেন, মমতার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার কথা রয়েছে। দু’টি অনুষ্ঠান কাছাকাছি পড়ে যাওয়ায় শেষ মুর্হূতে বান্দোয়ানের সভা বাতিল করতে হয়েছে। শান্তিরামবাবু জানিয়েছেন,আগামী ২ ডিসেম্বর বান্দোয়ানে মুখ্যমন্ত্রীর সভা হবে বলে প্রাথমিক ভাবে ঠিক হয়েছে। পুরুলিয়ার জেলাশাসক তন্ময় চক্রবর্তী জানিয়েছেন, অনিবার্য কারণে বৃহস্পতিবারের মুখ্যমন্ত্রীর সভা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। এই সভা পরের মাসের প্রথম দিকে হবে এ রকমই ঠিক হয়েছে।
কিন্তু সভার একদিন আগে এই খবরে বান্দোয়ানের অধিকাংশ বাসিন্দা হতাশ। বান্দোয়ানের ব্যবসায়ী মহম্মদ আকিল, সঞ্জয় হালদারের আফশোস, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী যেখানেই যান সেই এলাকার উন্নয়নের জন্য বিশেষ প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেন। বান্দোয়ানে তিনি এ রকম কিছু ঘোষণা করবেন বলে আমরা ভেবেছিলাম।’’
ডেকোরেটার কর্মীরাও জানান, মঞ্চের কাজ তাঁরা প্রায় শেষ করে এনেছিলেন। এরপর সামান্য কাজ বাকি ছিল। মুখ্যমন্ত্রীর সভায় ‘ডিউটি’ করার জন্য বিভিন্ন এলাকার থানায় নির্দেশ পৌঁছে গিয়েছিল। বুধবার সকালেই তাঁরা রাস্তার মোড়ে মোড়ে ও জঙ্গলের পথে নেমে পড়তেন। ওই নির্দেশও বাতিল করা হয়েছে। বান্দোয়ানে কুচিয়া, কুইলাপাল, রাজগ্রাম, গুড়পানা প্রভৃতি জায়গায় নিরাপত্তা রক্ষীদের যে সব শিবির রয়েছে এক সপ্তাহ আগে থেকে তাদের টহলদারি বাড়ানো হয়েছিল। এ ছাড়া জেলা পুলিশ লাইন থেকে কয়েকদিন আগেই বিশেষ পুলিশ বাহিনী বান্দোয়ানের বিভিন্ন রাস্তায় মোতায়েন করা হয়েছিল। মঙ্গলবার বিকেল থেকে তাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।
মুখ্যমন্ত্রীর সভা বাতিল হওয়ায় বান্দোয়ানের ছোট ব্যবসায়ীরাও হতাশ। এক বাদাম বিক্রেতা বলেন, ‘‘দিদির সভা হবে জেনে পুরুলিয়া থেকে ১৫ কেজি বাদাম এনেছিলাম। বাদাম হয়তো নষ্ট হবে না, তবে অনেক টাকা ফেঁসে রইল।’’
বান্দোয়ান বাসস্ট্যান্ডের এক হোটেল ব্যবসায়ীও জানান, মুখ্যমন্ত্রী আসবেন বলে তিনি প্রচুর সব্জি ও তেল, মশলা বাড়তি কিনে রেখেছেন। কিন্তু অত সব্জি নিয়ে কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না।
সিপিএমের জেলা সম্পাদক মণীন্দ্র গোপ বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী হঠাৎ সফর বাতিল করলেন। কিন্তু সরকারি কোষাগার থেকে ইতিমধ্যে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ হয়ে গেল প্রস্তুতিতে। এ গুলো তো সব জনগণের ঘাড়েই চাপবে।’’
তবে তৃণমূলের জেলা নেতা সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর কাছে জঙ্গলমহলের মানুষের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। বিরোধীরা যে যাই বলুক, মুখ্যমন্ত্রী ফের বান্দোয়ানে আসবেন। বান্দোয়ানবাসীকে তিনি হতাশ করবেন না।’’