প্রথমে বিশালাকৃতি বরফখণ্ড (সেরাক), পরে জনজট। বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টের (৮৮৪৯ মিটার) পথে বাধার অন্ত ছিল না। সে সব কিছু জয় করে বুধবার দুপুরে এভারেস্টের শীর্ষে আরোহণ করলেন হিন্দমোটরের বছর তিরিশের শুভম চট্টোপাধ্যায় ওরফে রনি। এর মাধ্যমে সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে সপ্তশৃঙ্গ (সাত মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ) এবং সপ্ত আগ্নেয়গিরি জয় করে রেকর্ড গড়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়েগেলেন তিনি।
চলতি বছরে এভারেস্টের পথে রেকর্ড পরিমাণ পারমিট (৪৯২টি) দিয়েছে নেপাল সরকার। যা ২০২৩ সালের (৪৭৯টি) পারমিটের সংখ্যার চেয়েও বেশি। ফলে পথে জনজটের আশঙ্কা ছিলই। সেই আশঙ্কা সত্যি হয়েছে বুধবার। তাঁর অভিযানের আয়োজক সংস্থা ‘এলিট এক্সপেড’-এর অপারেশনাল ম্যানেজার বিকাশ জানিয়েছেন, মঙ্গলবার মধ্যরাত নাগাদ ক্যাম্প ৪ থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন তাঁরা। একই রাতে সামিটের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন শতাধিক আরোহী ও শেরপা। ফলে পর্বতারোহীদের ভিড় বড় মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়ায়। সে কারণে আবহাওয়া ভাল থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় সময়ের থেকে অনেকটাই বেশি সময় লাগে। দুপুর ১২টা ৫১ মিনিট নাগাদ এভারেস্টের শীর্ষে পৌঁছন শুভম। এ দিন সন্ধ্যায় ক্যাম্প ৪-এ নেমে এসেছেন তিনি।
এ বার বাধার প্রাচীর হয়ে খুম্বু হিমবাহের উপরে ছিল দৈত্যাকার বরফখণ্ড। অভিজ্ঞ শেরপারা সব দিক খতিয়ে দেখে বিকল্প পথে বেসক্যাম্প থেকে ক্যাম্প ১ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিকল্প সেই পথে পাঁচটি মই জোড়া দিয়ে দৈত্যাকার ক্রেভাস পেরিয়ে, বিপজ্জনক সেরাককে পাশ কাটিয়েই শেরপা ও আরোহীরা উপরে ওঠা শুরু করেন গত মাসের শেষের দিকে। সে সময়ে অবশ্য অল্পের জন্য বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন শুভম। বেসক্যাম্পে ফিরে জানিয়েছিলেন, ক্যাম্প ১ যাওয়ার পথে খুম্বু হিমবাহের উপরে একটি সেরাককে পাশ কাটিয়ে আসার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সেটিকে চোখের সামনে ভেঙে পড়তে দেখেন। সেই ঘটনায় এক ভারতীয় আরোহী ও তাঁর শেরপা জখম হন। সেই ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল শুভমকে। তবে ইস্পাতকঠিন মনোবলে চিড় ধরাতে পারেনি। তাই গত সপ্তাহের শেষে এভারেস্টের সামিটের রুট খুলতেই সদলবলে আরও একবার উপরে উঠতে শুরু করেন ওই আরোহী।
শুভমের এই সাফল্যে স্বভাবতই খুশির হাওয়া মধ্য কলকাতায় তাঁর পর্বতারোহণ ক্লাবে। শুভমের বাবা চন্দন চট্টোপাধ্যায় বললেন, ‘‘বেসক্যাম্প থেকে ভিডিয়ো কলে কথা বলেছে। তবে গত ২ দিন ধরে চিন্তায় ছিলাম। আজ সকালে খবরটা পেয়ে খুশি হয়েছি, কিন্তু ও নেমে না আসা পর্যন্ত শান্তি নেই।’’ ক্লাবের তরফে বুদ্ধদেব দাস বললেন, ‘‘হাতে ধরে শুভমকে পাহাড় চিনিয়েছি। তাই ওর এই সাফল্যে খুব খুশি। আপাতত ওর ফেরার প্রতীক্ষায় আছি।’’
চলতি বছরে পর পর সফল আরোহণ করে স্বপ্নপূরণের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছেন শুভম। গত সেপ্টেম্বরে মানাসলু দিয়ে আটহাজারি শৃঙ্গে হাতেখড়ি পেশায় ব্যবসায়ী শুভমের। চলতি বছরে মাত্র ২৫ দিনে আন্টার্কটিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার তিনটি শৃঙ্গের শীর্ষ ছুঁয়েছেন। এর পরে ছুঁলেন এভারেস্ট। রেকর্ডের পথে এখনও বাকি মাত্র ২টি— উত্তর আমেরিকার দেনালি শৃঙ্গ এবং ইরানের দামাবান্দ আগ্নেয়গিরি (এশিয়ার সর্বোচ্চ)।
অন্য দিকে, এ বছর দ্বিতীয় বারের জন্য এভারেস্টে যাওয়া, কলকাতা পুলিশের কনস্টেবল লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল আপাতত উপরের দিকের ক্যাম্পে পৌঁছেছেন। সব ঠিক থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই এভারেস্টের শীর্ষে পৌঁছনোর চেষ্টা করবেন তিনি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)