চিংড়িঘাটা মেট্রোর বকেয়া কাজ নিয়ে হাই কোর্টের নির্দেশে হস্তক্ষেপ করল না সুপ্রিম কোর্ট। ওই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার শীর্ষ আদালতে মামলা করেছিল। সোমবার সেই মামলাটি ওঠে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিপুল মনুভাই পঞ্চোলীর বেঞ্চে। আদালত মামলায় হস্তক্ষেপ করতে চায়নি। উল্টে রাজ্য সরকারকে মামলা তুলে নিতে বলা হয়। তা না করা হলে মামলাটি সরাসরি খারিজ করে দেওয়া হবে, জানান বিচারপতি। চিংড়িঘাটা মেট্রোর বকেয়া কাজ নিয়ে রাজ্য সরকার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করেছে বলেও মন্তব্য করে আদালত।
কলকাতা মেট্রোর অরেঞ্জ লাইনের কাজ দীর্ঘ দিন ধরে শেষ না হওয়ায় রাজ্যকে ভর্ৎসনা করে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, “সব কিছু রাজনীতির মধ্যে টেনে আনবেন না। এটা উন্নয়নের বিষয়।” রাজ্যের বক্তব্য, এর আগে উৎসবের জন্য রাস্তা বন্ধ করা যায়নি। এখন নির্বাচনের ব্যস্ততা রয়েছে, তাই মে মাস পর্যন্ত সময় দেওয়া হোক। তাদের উদ্দেশে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, “আপনাদের কাছে উৎসবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, উন্নয়ন নয়! আপনারা হাই কোর্টে বলেছিলেন যে, উৎসবের দায়িত্ব সামলাতে হবে। তবে কি পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়নের চেয়ে উৎসব বেশি গুরুত্বপূর্ণ?" তাঁর পর্যবেক্ষণ, গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে আমরা আশা করি না যে, এই ধরনের বিষয়ে আমাদের দরজায় এসে দাঁড়াতে হবে। উন্নয়নের কাজ আটকে দেওয়ার জন্য আমরা রাজ্যকে আর এই অজুহাত ব্যবহার করতে দেব না। একই সঙ্গে প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, এটি এমন একটি মামলা, যেখানে রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং ডিজিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এটি রাজ্যের সাংবিধানিক দায়িত্বের সম্পূর্ণ অবহেলার প্রমাণ। এটা আসলে বিষয়টিকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার একটি চেষ্টা মাত্র। ওই মেট্রো প্রকল্পের কাজ শুরু নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশেই বহাল রাখে সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত জানায়, রাজ্য একগুঁয়ে মনোভাব দেখাচ্ছে এবং কলকাতা শহরের মেট্রো রেল প্রকল্পকে দেরি করানো ও আটকে দেওয়ার চেষ্টা করছে। হাই কোর্টের নির্দেশের মধ্যে কোনও ত্রুটি আমরা খুঁজে পাইনি।
কলকাতা হাই কোর্ট বকেয়া কাজ শেষ করার জন্য সময় বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু উচ্চ আদালতের সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সরকার সুপ্রিম কোর্টে যায়। সোমবার সেই মামলায় দেশের প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, ‘‘জনসাধারণের প্রকল্প নিয়ে রাজনীতি করবেন না। হাই কোর্টের নির্দেশ মেনেই কাজ হবে। হাই কোর্টই সময় বেঁধে দিয়ে কাজ করাবে।’’ আদালতের পর্যবেক্ষণ, চিংড়িঘাটা মেট্রো প্রকল্প নিয়ে রাজ্য সরকারের অবস্থান সংবিধানগত দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ গাফিলতি। উন্নয়ন আটকানোর জন্য জেদ করা হচ্ছে। এর পরেই রাজ্যের আইনজীবীর উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘‘কখনও বলছেন উৎসব চলছে, কখনও পরীক্ষা চলছে, এখন বলছেন নির্বাচন চলছে। সুযোগ দিচ্ছি, মামলা তুলে নিন। না হলে খারিজ করে দেব।’’
আরও পড়ুন:
চিংড়িঘাটা মেট্রোর কাজ নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে টানাপড়েন চলছে। মাত্র ৩১৬ বর্গমিটার অংশের জন্য আটকে রয়েছে নিউ গড়িয়া থেকে কলকাতা বিমানবন্দর পর্যন্ত মেট্রোর অরেঞ্জ লাইন সম্প্রসারণের কাজ। চিংড়িঘাটার একেবারে মোড়ে ওই অংশের কাজ শেষ করার জন্য সাময়িক ভাবে বাইপাসে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগ, রাজ্য সরকার অনুমতি দিচ্ছে না। ফলে কাজও এগোচ্ছে না। কলকাতা হাই কোর্ট এ বিষয়ে রাজ্য, কলকাতার পুলিশ কমিশনার, জয়েন্ট কমিশনার অফ পুলিশ (ট্রাফিক), ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশকে (ট্রাফিক) ছাড়পত্র (এনওসি) দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। জট কাটাতে আদালতের নির্দেশে মেট্রো, রাজ্য এবং নির্মাণকারী সংস্থার একাধিক বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু সমাধানসূত্র বেরোয়নি।
নির্মাণকারী সংস্থা জানিয়েছিল, সাময়িক যান নিয়ন্ত্রণ করে চিংড়িঘাটায় মেট্রোর বাকি কাজ শেষ করতে ন’মাস লাগবে। কিন্তু হাই কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও রাজ্য ‘এনওসি’ দেয়নি বলে অভিযোগ। ফলে কাজ শুরু করা যায়নি। বর্ষবরণের অনুষ্ঠান এবং গঙ্গাসাগর মেলার জন্য রাতের ট্রাফিক আটকানো যাবে না বলে আগে জানিয়েছিল সরকার। এ বার ভোটের জন্য সমস্যার কথাও বলা হয়েছে। রাজ্যের এই ভূমিকাতেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। বলা হয়েছে, হাই কোর্টের নির্দেশেই কাজ হবে।