পিছমোড়া করে বেঁধে চুলের মুঠি ধরে সারা শরীরে লাথি মারা হচ্ছে। থেকে থেকে আর্তনাদ করে উঠছেন ৪৫ বয়সী আলু ব্যবসায়ী দুলাল ঘোষ।
মোবাইলে দৃশ্যটা দেখে প্রথমে জ্ঞান হারিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী। প্রথম ধাক্কাটা সামলে মোবাইল নিয়ে ধূপগুড়ি থানায় নিয়ে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন ওই আলু ব্যবসায়ীর স্ত্রী। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো নির্যাতনের ভিডিও দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন ধূপগুড়ি থানার আইসি সঞ্জয় দত্ত-ও। প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশের বড় কর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছিলেন। যে করেই হোক ওই ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করতেই হবে, ঠিক করেছিলেন পুলিশকর্মীরা। সোমবার দুপুরে তাঁকে উদ্ধারের খবর চাউর হতেই ধূপগুড়ি তো বটেই, শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ির ব্যবসায়ী মহলে স্বস্তির ছাপ। তবে রয়েছে উদ্বেগও।
শিলিগুড়ি নিয়ন্ত্রিত বাজারের প্রবীণ আলু এবং সব্জি ব্যবসায়ী তথা ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবল কমিশন এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম কর্মকর্তা তপন কুমার সাহা বলেন, ‘‘এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগজনক। আমাদের তো আলু-পেঁয়াজের জন্য জালন্ধরে যোগাযোগ রাখতেই হয়। আশা করব, এর পরে সেখানকার পুলিশ আরও নজরদারি বাড়াবে।’’
ধূপগুড়ি শহরের হাসপাতাল পাড়া লাগোয়া ভাওয়ালপাড়া এলাকায় আলু ব্যবসায়ী দুলালবাবুর বাড়ির। দুই এলাকার প্রায় সকলেই তাঁকে ভাল করে চেনেন। ব্যবসার সুবাদে নিয়মিত জালন্ধর যাতায়াত রয়েছে তাঁর। সেই দুলালবাবু অপহরণ হওয়ার খবর চাউর হয়ে এলাকার অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কেউ জানতে চান, দীর্ঘদিন ধরে জালন্ধরে যাতায়াত করার সুবাদে কোনও ব্যবসায়িক শত্রুতার জন্য ওই ঘটনা ঘটেছে কি না। শুধু তাই নয়, অতীতের কোনও গোলমালের জেরে এমন হয়েছে কি না তা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু, মারধরের ভিডিও ফুটে ছড়িয়ে পড়তেই সব কিছুকে ছাপিয়ে দ্রুত ব্যবসায়ীকে উদ্ধারের দাবিতে সরব হন সকলেই। উদ্ধারের পরে বাড়ির লোকজন অবশ্য দাবি করেছেন, পুরানো কোনও শত্রুতার বিষয় নেই। টাকা আদায়ের ছকেই পেশাদার অপহরণকারীরা ওই কাণ্ড ঘটিয়েছে। নর্থ বেঙ্গল চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সম্পাদক পুরজিৎ বক্সি গুপ্ত বলেন, ‘‘এ রকম ঘটনা ঘটতে থাকলে, ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়বেন। কেউ তো বাইরে যেতেই চাইবেন না। ব্যবসায় প্রভাব পড়বে।’’
ধূপগুপির মত হলদিবাড়িও কৃষি প্রধান এলাকা। এখানকার ব্যবসায়ীরা প্রায়শই লঙ্কা ও টোম্যাটোর জন্য গোটা উত্তর ভারতে ব্যবসা করতে যান। হলদিবাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক বিশ্বজিৎ সরকার বলেন, ‘‘রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার দিকটি মাথায় রাখতে হবে। ব্যবসায়ী এলাকাগুলিতে সব সময় নজরদারি প্রয়োজন। বিশেষ করে যে সমস্ত এলাকায় ভিন রাজ্যের ব্যবসায়ীরা যাতায়াত করেন।’’
শিলিগুড়ি এবং জলপাইগুড়ির ব্যবসায়ীদের অনেকের দুশ্চিন্তা অবশ্য যাচ্ছে না। কারণ, অনেকেই ব্যবসার কারণে বাইরে যেতে হয়। বাইরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আলু সরবরাহের কারবারও রয়েছে অনেকে। অনেকে চাষের জন্য সরঞ্জাম বা বীজ কিনতেও বাইরে যান। সে ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ডুয়ার্সের কয়েকজন ব্যবসায়ীর কথায়, এই ঘটনার পর নতুন করে ভাবতে হবে। ধূপগুড়ির সার ব্যবসায়ী অলক ঘোষ বলেন, ‘‘আমাদেরও অনেক সময় ব্যবসার কাজে বাইরে যেতে হয়। এই ঘটনা শোনার পর দুশ্চিন্তায় রয়েছি। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে তার জন্য সার্বিকভাবে পুলিশ প্রশাসনকে কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে।
শিলিগুড়ি নিয়ন্ত্রিত বাজার সমিতির ফল ও সব্জি ব্যবসায়ী সংগঠনের সদস্য বাবুল পাল এই ঘটনায় আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে ‘‘এদিক কার অনেক ব্যবসায়ী মোটা টাকা নিয়ে বাইরের রাজ্যে ব্যবসার খাতিরে যান। এমন হলে বাংলার ব্যবসায়ীরা জালন্ধরে যেতে ভয় পাবেন। দুই রাজ্যের পুলিশের উচিত দ্রুত বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে নিরাপত্তা বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া।’’ শিলিগুড়ির এক কাঁচা সব্জি ব্যবসায়ী গোপাল কর্মকারের দাবি, এই কাঁচামালের ব্যবসার উপরে প্রচুর টাকা রাজস্ব আদায় হয় সরকারে। তাই ব্যবসায়ী নিরাপত্তার দিকে নজর দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে তাঁরা উত্তরবঙ্গের ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আন্দোলন করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।