Advertisement
E-Paper

নির্মল গ্রামের ঝুটো মুকুটে হতাশ দুরমুঠ

টিভির পর্দায় নিয়মিত ভেসে ওঠে পরিচিত নায়িকার মুখ, পরিচ্ছন্ন শৌচালয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নানা কথা শোনা যায়। সে সব কথা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় বেতালিয়া গ্রামের বাসিন্দাদের। কিন্তু সকাল হলেই তাঁরা ছোটেন মাঠের ধারে। ছেলে বুড়ো, মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই উন্মুক্ত শৌচে অভ্যস্ত।

সুব্রত গুহ

শেষ আপডেট: ২৬ জানুয়ারি ২০১৬ ০৩:২৯
গ্রামের শৌচালয়গুলির হাল এমনই।

গ্রামের শৌচালয়গুলির হাল এমনই।

টিভির পর্দায় নিয়মিত ভেসে ওঠে পরিচিত নায়িকার মুখ, পরিচ্ছন্ন শৌচালয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নানা কথা শোনা যায়। সে সব কথা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় বেতালিয়া গ্রামের বাসিন্দাদের। কিন্তু সকাল হলেই তাঁরা ছোটেন মাঠের ধারে। ছেলে বুড়ো, মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই উন্মুক্ত শৌচে অভ্যস্ত। অথচ কাঁথি ৩ ব্লকের দুরমুঠ গ্রাম পঞ্চায়েতকে গত নভেম্বরে পুরস্কৃত করেছে রাজ্য সরকার। মুকুটে গুঁজেছে নির্মল গ্রামের পালক। পঞ্চায়েত কার্যালয় আলো করে শোভা পাচ্ছে শংসাপত্র— ‘উন্মুক্ত শৌচকর্ম নির্মূল গ্রামপঞ্চায়েত’।

এর মধ্যে নগ্ন রাজনীতি ছাড়া অন্য কিছুই যে দেখা যাচ্ছে না, তা সোচ্চারে জানিয়েছেন পঞ্চায়েতের বিরোধী নেতারা। যেখানে বেতালিয়ার মতো গ্রাম রয়ে গিয়েছে, সেখানে একটি পঞ্চায়েতকে কী ভাবে উন্মুক্ত শৌচ একশো শতাংশ নির্মূল হয়েছে বলে দেখাল প্রশাসন— সে কথা ভেবে অবাক বেতালিয়ার বাসিন্দারাও। গ্রামের বর্ষীয়ান বাসিন্দা শেখ ইউসুফ যা জানালেন তা ভারি আশ্চর্যের। তিনি বলেন, “ব্লকের নতুন বিডিও তো দু’দিন আগেই গ্রাম ঘুরে সব কিছু দেখে গিয়েছেন। খোলা জায়গায় মলত্যাগ বন্ধ করার উদ্যোগ নেবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু খোলা জায়গায় মলত্যাগ করতে পঞ্চায়েতের কেউ নিষেধ তো করেননি, এমনকি শৌচালয়ও তৈরি করে দেয়নি।”

দুরমুঠ গ্রাম পঞ্চায়েত তৃণমূলের দখলে। পঞ্চায়েতের বিরোধী সিপিএম সদস্য শেখ জামাল মহম্মদের অভিযোগ, দুরমুঠ পঞ্চায়েতের বেতালিয়া সংসদে ৩৩৭টি পরিবারের বাস। তার মধ্যে একশোটির বেশি পরিবারে কোন শৌচাগার নেই। জামাল মহম্মদের দাবি, বাকি পরিবারগুলিতে নব্বইয়ের দশকে বামফ্রন্টের আমলে দেওয়া হয়েছিল কিছু স্যানিটারি প্লেট। এখন সে গুলি বেশির ভাগই ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। সাধারণের ব্যবহারের জন্য দু’একটি শৌচালয় ছিল। সেগুলির অবস্থাও করুণ।

Advertisement

ত্রিপল ঘেরা এমন শৌচালয় ব্যবহার করেন গ্রামের কয়েকজন

বেতালিয়া গ্রামে ঢুকে শৌচালয়ের খোঁজ করতেই উত্তেজিত হয়ে গেলেন সালেহা বিবি। ওই গ্রামেরই বাসিন্দা তিনি। গলা প্রায় সপ্তমে চড়িয়ে জানালেন, “গ্রামে ক’টা বাড়িতে শৌচালয় আছে, ক’টা বাড়িতে নেই পঞ্চায়েত আর ব্লক অফিসেরবাবুরা তা লিখে নিয়ে গিয়েছেন।’’ পরিপার্শ্ব নিয়ে যে সচেতন সালেহা বিবি তা বেশ বোঝা যায় তার পরের বাক্যে। কড়া গলায় প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘‘পুরস্কার দিয়ে নাটক করছেন?” পাশে দাঁড়িয়ে ব্যঙ্গ করেন বৃদ্ধা বারজান বেওয়াও, “বাড়িতে শৌচালয় থাকলে আমরা কি শখ করে লাজ-শরমের মাথা খেয়ে মাঠেঘাটে দৌড়ই?”

শুধু মহিলারাই নন, গ্রামে রিকশাচালক মাসুম আলি খান, গ্যারেজ কর্মী শেখ মইমুদ বুঝে উঠতেই পারছেন না, কিসের ভিত্তিতে দুরমুঠ গ্রামপঞ্চায়েত পুরস্কার পেল! মাসুম আলির কথায়, “বেতালিয়া গ্রামে শৌচালয়ের সমস্যা তো দীর্ঘদিনের। নির্মল বাংলা প্রকল্পে সরকারি খরচে শৌচালয় হবে শুনেছিলাম। আশা করেছিলাম আমরাও পাব।’’ শেখ মইমুদ বলেন, ‘‘এই তো সে দিন শুনলাম পঞ্চায়েতের ঘরে ঘরে নাকি শৌচালয় তৈরি হয়ে গেছে! সে জন্য পুরস্কারও মিলেছে। তাহলে বেতালিয়া গ্রাম বাদ পড়ল কেন?”

একটি গ্রামে যেখানে অবাধ চলে উন্মুক্ত শৌচকর্ম, সেখানে ওই গ্রামপঞ্চায়েতকে নির্মল গ্রাম ঘোষণা করার বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্বয়ং জেলা স্বাস্থ্য কর্মাধ্যক্ষ। আরও অবাক করে দিয়ে জেলা স্বাস্থ্য কর্মাধ্যক্ষ পার্থপ্রতিম দাস বলে বসলেন, “এমন ঘটনার কথা জানি না তো। আনন্দবাজারের কাছেই প্রথম শুনলাম। একশো শতাংশ নির্মূল না হয়েও যদি নির্মল গ্রাম পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে, তবে নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হয়েছে।” এরপর নিয়ম মেনে পার্থবাবু আশ্বাস দিয়েছেন, ‘‘বিষয়টি খোঁজি নিয়ে দেখা হবে।’’

মিশন নির্মল বাংলা প্রকল্পের আওতায় পূর্ব মেদিনীপুরের ১১০টি গ্রাম পঞ্চায়েত ও সাতটি পঞ্চায়েত সমিতিকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে একমাত্র মাপকাঠি একশো শতাংশ বাড়িতে শৌচাগার তৈরি এবং উন্মুক্তস্থানে শৌচকর্ম না-করার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ। অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন দুরমুঠ গ্রামপঞ্চায়েত উপপ্রধান স্বপন মাইতিও। বরং তিনি তুলে ধরলেন আরও নগ্ন সত্যটি, ‘‘এখন শুকনো আবহাওয়ায় মাঠেঘাটেই শৌচ সারেন বাসিন্দারা। কিন্তু বর্ষায় তাঁরা আসেন রাস্তার ধারেই। বাধ্য হন।”

এমন সত্যতা থাকলেও কী করে শৌচাগার তৈরির তালিকা থেকে বেতালিয়ার নাম বাদ গেল? তার কারণ হিসেবে প্রকল্পের সমীক্ষা তালিকাকেই দায়ী করেছেন স্বপনবাবু, “২০১২সালের যে তালিকাকে ভিত্তি করে প্রকল্পের অভিযান চালানো হয় সেই তালিকাটিই ভুলে ভরা ছিল। বেতালিয়ার শৌচাগারহীন বেশিরভাগ পরিবারের কোনও উল্লেখ নেই সেখানে।” তবে শুধু বেতালিয়া নয়, দুরমুঠ গ্রামপঞ্চায়েতের ১২টি সংসদেই শৌচাগারহীন বহু পরিবার রয়েছে বলে স্বপনবাবু স্বীকার করেছেন।

২০১২ সালে ব্লকের আশাকর্মীদের দিয়ে সমীক্ষা করা শৌচাগারহীন পরিবারের তালিকা তৈরি হয়েছিল। তখনই ভুল তালিকার অভিযোগ তুলে বেতালিয়ার বাসিন্দারা গ্রামপঞ্চায়েত অফিস ঘেরাও করেছিলেন। সুরাহা হয়নি। তালিকায় কোনও ভুল ছিল বলে মনে করেন না কাঁথি ৩ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি বিকাশ বেজ।

বিকাশবাবু অবশ্য শুনিয়েছেন অন্য তত্ত্ব, “তালিকা তৈরির পর বহু একান্নবর্তী পরিবার ভেঙেছে। বেড়েছে পরিবারের সদস্য সংখ্যাও। তার ফলেই এখন মনে হচ্ছে অনেক পরিবারের নাম তালিকায় নেই।”

কাঁথি ৩ বিডিও মহম্মদ নূর আলম জানিয়েছেন, “২০১২ সালে ব্লকের ৮টি গ্রামপঞ্চায়েতে শৌচাগার তৈরি ও উন্মুক্ত-শৌচ নির্মূলের অভিযান নেওয়া হয়। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ায় দুরমুঠ-সহ ব্লকের আটটি গ্রামপঞ্চায়েতের মধ্যে ছ’টিকে পুরস্কৃত করেছে জেলা প্রশাসন।” বেতালিয়ার সমস্যা সমাধানের গ্রামের কবরস্থানের কাছে পঞ্চায়েতের ‘একশো দিনের কাজ’ প্রকল্পে একটি ‘গণশৌচালয়’ তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নূর আলম। কিন্তু তাতে বিতর্খ মেটেনি। পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় মিশন নির্মল বাংলা প্রকল্প নিয়ে রাজনীতির অভিযোগ তুলেছেন কাঁথি ৩ ব্লকের সিপিএম নেতা ঝাড়েশ্বর বেরা। তাঁর অভিযোগ, “দুরমুঠ গ্রামপঞ্চায়েতের অধিকাংশ এলাকাতে শৌচাগারহীন পরিবার। আর তৃণমূল পরিচালিত গ্রামপঞ্চায়েত পাচ্ছে নির্মল পুরস্কার। এর চেয়ে জঘন্য দলীয় রাজনীতি আর কী হতে পারে?”

ছবি: সোহম গুহ

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy