Advertisement
E-Paper

কালীঘাট কাঁপানো ১৩ দিন! দিল্লিতে শুরু, বিধানসভায় শেষ অপারেশন তৃণমূল, ভাঙনের রোজনামচার পদে পদে বিস্ময়

দলটির বয়স ২৮ বছর পাঁচ মাস। কংগ্রেস ভেঙে বেরিয়ে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল তৈরি করেছিলেন ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি। ৩ জুন, ২০২৬ ভেঙে গেল তৃণমূল। তীব্র বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে উঠে এসে দেড় দশক শাসন ক্ষমতায় থাকার পর মাত্র ১৩ দিনে লন্ডভন্ড হয়ে গেল দিদির জোড়াফুলের বাগান।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ ২০:২৯
What unfolded in 13 days that shook TMC, a timeline

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ।

রুশ দেশের বলশেভিক বিপ্লব নিয়ে জন রি়ড লিখেছিলেন ‘দুনিয়া কাঁপানো ১০ দিন’। যে বিপ্লবের পরে ভেঙে পড়েছিল জারের শাসন। প্রাক্তন সিপিএম নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ দেখল ‘কালীঘাট কাঁপানো ১৩ দিন’! এ-ও এক বিপ্লবই বটে। যার জেরে ভেঙে গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল। দল থেকে সিপিএম বহিষ্কার করার পরে তৃণমূল করেছেন ঋতব্রত। গত পাঁচ বছরে একাধিক বার বলেছেন, মমতার মধ্যে তিনি লেনিনকে দেখতে পান। বলশেভিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লেনিনই। আর তৃণমূল চুরমার করার নেতৃত্ব দিলেন মমতাকে ‘লেনিন’ বলা ঋতব্রত।

দলটির বয়স ২৮ বছর পাঁচ মাস। কংগ্রেস ভেঙে বেরিয়ে এসে মমতা তৃণমূল তৈরি করেছিলেন ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি। ৩ জুন, ২০২৬ ভেঙে গেল তৃণমূল। তীব্র বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে উঠে এসে দেড় দশক শাসন ক্ষমতায় থাকার পর মাত্র ১৩ দিনে লন্ডভন্ড হয়ে গেল দিদির জোড়াফুলের বাগান। ২২ মে যার সূচনা হয়েছিল দিল্লির বঙ্গভবনে। যে দিন রাজধানীতে ‘আচমকা’ দেখা হয়ে গিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আর তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রতের। ভোটের ফলপ্রকাশ হয়েছিল ৪ মে। জুনের ৪ তারিখ আসার আগেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল তৃণমূল।

তবে, ২২ মে-র আগেও বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছিল। যা কালীঘাট কাঁপানো ১৩ দিনের ভিতপুজো করে দিয়েছিল। ৪ মে ফল ঘোষণার পরে ৬ মে কালীঘাটের বাড়ির লাগোয়া দফতরে জয়ী বিধায়কদের বৈঠক ডেকেছিলেন মমতা। সেই বৈঠকেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাকে সম্মান জানাতে সকলকে উঠে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন মমতা। যা তৃণমূলের অনেককেই ক্রুদ্ধ করে তুলেছিল। তার পর থেকেই তৃণমূলের পরিষদীয় দলে ঐক্যের সুর কাটতে শুরু করে। ১৯ মে ফের একটি বৈঠক হয় কালীঘাটে। সেখানেই প্রথম বিস্ফোরণ ঘটান ঋতব্রত এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা। ফলতার জাহাঙ্গির খান ভোটের মাঠ ছাড়ার ঘোষণার পরেও কেন তাঁকে দল বহিষ্কার করছে না, সেই প্রশ্ন তোলেন ঋতব্রত এবং সন্দীপন। তৃণমূল তথা দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে এ কথা সর্বজনবিদিত যে, জাহাঙ্গির অভিষেকের লোক। ফলে ঋতব্রতদের নিশানায় যে আসলে ছিল অভিষেক, তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। সেই বৈঠকেই ঋতব্রত এবং সন্দীপনের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বিদ্রোহী হয়েছিলেন বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ। সে দিন এক গাড়িতেই মমতার বাড়িতে পৌঁছেছিলেন তিন জন। পরে অবশ্য এই দু’জনের সঙ্গে আর এক বন্ধনীতে থাকেননি কুণাল (মতান্তরে রাখা হয়নি)। বরং ঋতব্রতদের বিরোধী হিসাবে আবির্ভূত হন বেলেঘাটার বিধায়ক।

২২ মে, শুক্রবার

গত এপ্রিলে ঋতব্রতের রাজ্যসভার সাংসদ পদের মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু বিধানসভা ভোটের জন্য তিনি গিয়ে সাংসদের বাংলো ছেড়ে দেওয়া, কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট নেওয়ার মতো কিছু প্রক্রিয়াগত কাজ করতে ২১ মে দিল্লি গিয়েছিলেন। ২২ মে মধ্যাহ্নভোজ সারতে যান দিল্লির বঙ্গভবনে। সেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে যায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর। সেই ‘আচমকা’ সাক্ষাতের পরে ঋতব্রত নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বলেছিলেন। শুভেন্দু তাঁকে জানিয়েছিলেন, রাজ্যের প্রশাসনিক বৈঠকগুলিতে বিরোধী বিধায়ক, সাংসদদের ডাকা হবে। সেই প্রসঙ্গে ঋতব্রত বলেছিলেন, ‘‘‘ব্যক্তি হিসাবে আমি মনে করি, মুখ্যমন্ত্রীর এই অভিমুখ ইতিবাচক ও সদর্থক। এটাই হওয়া উচিত।’’ শুভেন্দুর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ এবং ইতিবাচক মন্তব্য ছিল ‘তাৎপর্যপূর্ণ’।

২৫ মে, সোমবার

ওই দিন থেকেই তৃণমূলের অন্দরে সই বিতর্ক দানা বাঁধতে শুরু করে। অভিযোগ ওঠে, বিধানসভার বিরোধী দলনেতা, উপদলনেতা, মুখ্যসচেতক কে হবেন, সেই প্রস্তাব সংক্রান্ত যে নথি দলের তরফে বিধানসভার স্পিকারের কাছে পাঠানো হয়েছে, তাতে কয়েক জন বিধায়কের সই নকল করা হয়েছে। অভিযোগ ওঠে, পুরনো তারিখে সই করিয়ে নেওয়ারও। তার আগে অভিষেকের চিঠিকে খারিজ করে দিয়েছিলেন স্পিকার। ফলে আনুষ্ঠানিক ভাবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়নি বিধানসভা।

২৭ মে, বুধবার

সই-জালের অভিযোগ তুলে বিধানসভার স্পিকারকে চিঠি দেন ঋতব্রত এবং সন্দীপন। তার ভিত্তিতেই বিধানসভার সচিবালয় হেয়ার স্ট্রিট থানায় অভিযোগ দায়ের করে। যার ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে সিআইডি। এই পর্ব থেকেই পৃথক ব্লক তৈরির প্রস্তুতিও শুরু হয়ে যায় তৃণমূল পরিষদীয় দলের মধ্যে। শুরু হয় ফোনাফুনি, গোপন বৈঠক।

২৮ মে, বৃহস্পতিবার

সই-কাণ্ডে তদন্ত শুরু করে সিআইডি। চৌরঙ্গীর বিধায়ক নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, ডোমজুড়ের বিধায়ক তাপস মাইতি, ক্যানিং পূর্বের বিধায়ক বাহারুল ইসলামদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে রাজ্য সরকারের তদন্তকারী সংস্থা। যে ঘটনা তৃণমূল পরিষদীয়দলের অন্দরে তোলপাড় ফেলে দেয়।

৩০ মে, শনিবার

সোনারপুরে গিয়ে ‘আক্রান্ত’ হন অভিষেক। তাঁকে ঘিরে ধরে শারীরিক হেনন্থা করেন স্থানীয়রা। ছোড়া হয় ডিম, ঢিল। ছিঁড়ে যায় জামা, হাতের ফিটনেস ব্যান্ড। মাথায় হেলমেট পরা না-থাকলে আরও বড় কিছুও ঘটতে পারত। সেই ঘটনা নিয়ে সর্বভারতীয় স্তরের বিজেপি-বিরোধী নেতারা সরব হলেও তৃণমূলের হাতে গোনা জনপ্রতিনিধি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে প্রতিবাদ করেছিলেন। দল প্রতিবাদে নামার ডাক দিলেও মাঠেময়দানে কাউকে সে ভাবে দেখা যায়নি।

৩১ মে, রবিবার

২৮ মে থেকে যে ভাঙনের জয়গান শুরু হয়েছিল, তার প্রতিফলন দেখা যায় এই দিন মমতার বাড়িতে। ফের এক বার জয়ী বিধায়কদের বৈঠকে ডেকেছিলেন তৃণমূলের সর্বময়নেত্রী। কিন্তু ৮০ জনের মধ্যে মাত্র ২০ জন সেখানে হাজির হন। ‘কোরাম’ না-হওয়ার কারণে বৈঠক বাতিল করে দিতে হয় তৃণমূলকে।

১ জুন, সোমবার

নবান্ন থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু জানান, সই জাল-কাণ্ডে ঋতব্রত এবং সন্দীপনের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সিআইডি তদন্ত শুরু করেছে। ২৭ তারিখে যে তাঁরা চিঠি দিয়েছিলেন, তা চাপা ছিল। শুভেন্দু দু’জনের নাম বলে দিতেই পদক্ষেপ করে তৃণমূল। সাংবাদিক বৈঠক শেষ হওয়ার ১৫ মিনিটের মধ্যে ঋতব্রত এবং সন্দীপনকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করে তৃণমূল। তার পরে দেখা যায়, তাঁরা মূল নিশানা করছেন ‘যুবরাজ’ অভিষেককে। সেই সূত্রেই বিদ্রোহী শিবিরের অন্দরে এই গোটা অভিযানের নামকরণ হয় ‘অপারেশন ক্রাউন প্রিন্স’।

২ জুন, মঙ্গলবার

তৃণমূলের দূত হয়ে দুই বিধায়ক কুণাল এবং অসীমা পাত্র বিধানসভায় গিয়ে ফের একটি চিঠি রেখে আসেন স্পিকারের সচিবালয়ে। অভিষেকের স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে ফের শোভনদেবকে বিরোধী দলনেতা, নয়না ও অসীমাকে উপদলনেতা এবং ফিরহাদ হাকিমকে মুখ্যসচেতক করার দাবি জানানো হয়। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাবে কুণালদের চিঠি গ্রহণ করেনি স্পিকারের সচিবালয়। তাঁরা টেবিলে রেখে বেরিয়ে আসেন। অন্য দিকে ঋতব্রতদের শিবিরে সমর্থন বাড়তে থাকে।

৩ জুন, বুধবার

সকাল ১০টা থেকে বিধানসভায় প্রবেশ করতে শুরু করেন তৃণমূল বিধায়কেরা। ৫৮ জনের স্বাক্ষরিত চিঠি স্পিকারের হাতে জমা দেন ঋতব্রত, সন্দীপনেরা। যেখানে ঋতব্রতকে বিরোধীদলনেতা হিসাবে মেনে নিয়েছেন বাকিরা। চার উপদলনেতার মধ্যে রয়েছেন জাভেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন, সন্দীপন ও শিউলি সাহা। মুখ্যসচেতক করা হয়েছে আখরুজ্জামানকে। তার পরেই ঋতব্রত, সন্দীপনেরা চলে যান নবান্নে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর ডাকা প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিতে। যেমনটা ঋতব্রত জানিয়েছিলেন ২২ মে। দিল্লির বঙ্গভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর। শুধু ঋতব্রতেরা নন। তাঁদের সঙ্গে না-থাকা নয়না, কুণাল, ববিরাও হাজির ছিলেন নবান্ন-বৈঠকে।

Mamata Banerjee Abhishek Banerjee TMC West Bengal Politics
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy