দলের কর্মীর অন্তঃসত্ত্বা দিদির পেটে লাথি মারার ঘটনায় নাম জড়ানো পুতুল গড়াইকে মহিলা তৃণমূলের শহর সভানেত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দিয়েও বিরোধীদের মুখ বন্ধ করতে পারছে না তৃণমূল। কারণ পুলিশ পুতুলকে গ্রেফতার করতে পারেনি। আর এটাকেই হাতিয়ার করেছে বিরোধীরা। তাঁরা বলতে শুরু করেছেন, তৃণমূল নেতাদের চাপেই পুলিশ পুতুলকে ধরছে না।
এই পরিস্থিতিতে বিধানসভা ভোটের আগে ‘পুতুল-কাণ্ড’কে ঘিরে এলাকায় রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের ছক কষা শুরু করে দিয়েছে বিরোধী দলগুলি। ইতিমধ্যেই নির্যাতিতার বাড়িতে গিয়ে দেখা করে এসেছেন এলাকার সিপিএম নেতারা। আবার ফোনে ওই পরিবারকে যাবতীয় সাহায্যের আশ্বাসও দিয়েছেন বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব। বিরোধী দলগুলির এই সক্রিয়তা নজর এড়ায়নি শাসকদলের নেতাদেরও।
সোনামুখীর তৃণমূল পুরপ্রধান সুরজিৎ মুখোপাধ্যায় প্রকাশ্যেই বলছেন, “ভোটের মুখে দলের ভাবমূর্তি খারাপ হল এলাকায়। বিরোধীরা রাজনৈতিক ভাবে এই সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে। নির্যাতিত পরিবারের সঙ্গে বিজেপি, সিপিএম সব দলই নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। অভিযুক্ত গ্রেফতার না হওয়ায় সাধারণ মানুষের নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে আমাদের।”
বস্তুত সোনামুখীতে রাজনৈতিক গোলমাল মাঝে মধ্যে হলেও কখনও রাজনীতির লোকেদের গৃহস্থের বাড়িতে ঢুকে হামলা চালাতে দেখা যায়নি। তাই এক সপ্তাহ আগে গত রবিবার সোনামুখীর ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নিসার আলম আনসারির বাড়িতে সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে পুতুল গড়াইয়ের হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠার পরেই এলাকায় আতঙ্ক ছড়ায়। একে পুতুল এলাকার দাপুটে বিধায়ক তৃণমূলের দীপালি সাহার ঘনিষ্ঠ। তার উপরে দীপালি বিরোধী বলে পরিচিত পুরপ্রধান সুরজিতের অনুগামীরা নিসারের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে থানায় বিক্ষোভ দেখিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেফতারের দাবি করার পরেও পুলিশ একজনকেও ধরেনি। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন বলে জানিয়েছেন।
তৃণমূলের অস্বস্তির আরও কারণ হল, ওই ঘটনায় পারিবারিক সমস্যার মীমাংসার নামে শাসকদলের নেতা-কর্মীদের মাতব্বরিও ছবিও বেআব্রু হয়ে পড়েছে। সুরজিতের অনুগামী নিসারের বছর খানেক আগে এলাকার একটি মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়। কিন্তু বধূ নির্যাতনের অভিযোগে জেল খেটে তিনি সম্প্রতি বাড়ি ফিরেছে। নিসারের দাবি, বিয়ের যৌতুক ফিরিয়ে নিয়ে যেতেই পুতুল তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকেদের হয়ে দলবল নিয়ে হামলা চালায়। যদিও ওই তরুণী ও দীপালির দাবি, নিসার হুমকি দেওয়ার তাঁকে সতর্ক করতেই পুতুলরা সে দিন গিয়েছিলেন। কিন্তু গোলমাল পাকে ওই বাড়িতে ঢুকে পুতুল-বাহিনীর হামলাকে ঘিরে। অভিযোগ, ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিসারের মা ও দিদিকে কোপ মারে। অন্তঃসত্ত্বা দিদির পেটে লাথি মারার মতো মারাত্মক অভিযোগও ওঠে পুতুলদের বিরুদ্ধে। মারতে মারতে ঘর থেকে নিসারের মাকে কিছুদূর টেনেও নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ। পরে এলাকাবাসী প্রতিবাদ করতে এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
তৃণমূলের অস্বস্তির আরও কারণ হল, দলেরই এক নেত্রীকে গ্রেফতারের দাবিতে মঙ্গলবার সোনামুখী থানায় বিক্ষোভ দেখান দলেরই পুরপ্রধানের অনুগামীরা। এতে দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বও প্রকাশ্যে এসে পড়েছে। তেমনই পুলিশের ভূমিকা নিয়েও বিরোধীরা হাতে হাতিয়ার পেয়ে গিয়েছে। হইচই হওয়ায় পুতুলকে মহিলা তৃণমূলের সোনামুখী শহর সভানেত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। যদিও সব কিছুকে ছাপিয়ে বিধায়ক দীপালি সাহা নিজের অনুগামী পুতুলের পক্ষেই সওয়াল করেছিলেন। আর তাতেই এলাকাবাসীর একাংশের ক্ষোভের আগুনে ঘি পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দলেরই একাংশ এলাকায় নিজেদের ভাবমূর্তি ফেরাতে অবিলম্বে পুতুলকে গ্রেফতার করার দাবি তুলছে।
যদিও ঘটনার পর একটা সপ্তাহ পার হলেও মূল অভিযুক্ত পুতুল তো দূর, ঘটনায় অভিযুক্ত কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ! নির্যাতিত পরিবারের তরফেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। তদন্তকারীদের অবশ্য দাবি, পুতুলের খোঁজে তল্লাশি চালানো হচ্ছে তাঁর বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি, বাপেরবাড়ি-সহ ঘনিষ্ঠদের বাড়িতেও। যদিও তৃণমূলের একাংশই অভিযোগ, পুতুল এলাকাতে থাকলেও দলেরই একটি অংশের চাপে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করছে না। জেলা পুলিশ অবশ্য কোনও রকম চাপের কথা মানতে চায়নি।
এই পরিস্থিতিতে আসরে নেমে পড়েছেন বিরোধীরা। নিসারের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে বিজেপি ও সিপিএম। নিসারকে ফোন করে সমবেদনা জানান বিজেপির রাজ্য নেতা সুভাষ সরকার। এমনকী তাঁর দিদির কোনও চিকিৎসার প্রয়োজন পড়লে সুভাষবাবু নিজের নার্সিংহোম থেকেও যাবতীয় সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে জানাচ্ছেন খোদ নিসারই। আবার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন সিপিএম কাউন্সিলর এবং সোনামুখীর প্রাক্তন পুরপ্রধান কুশল বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ প্রবীণ সিপিএম নেতারাও সমবেদনা জানাতে বাড়িতে এসেছিলেন বলে জানাচ্ছেন নিসার। তাঁর ক্ষোভ, “ঘটনায় মূল অভিযুক্ত পুতুল তো বটেই, হামলায় জড়িত কাউকেই এখনও গ্রেফতার করল না পুলিশ। সিপিএম, বিজেপি দু’ই দলই ঘটনার নিন্দা করে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।’’
এখানে প্রশ্ন উঠছে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি নির্যাতিত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কেন প্রকাশ্যে এখনও এই ঘটনার বিরোধিতায় নামছে না? এ ক্ষেত্রে বিজেপি ও সিপিএম দু’টি দল থেকেই দু’টি পৃথক উত্তর উঠে আসছে। একদিকে সাংগঠনিক দুর্বলতায় ভুগছে বিজেপি। অন্যদিকে সিপিএম বিধানসভা ভোটের সমীকরণ কষেই প্রকাশ্য বিরোধিতা এড়িয়ে যাচ্ছে।
জেলা বিজেপির এক নেতার কথায়, “সোনামুখীতে আমাদের সংগঠন দুর্বল। তবে রাজ্য নেতৃত্বকে নির্যাতিত পরিবারের কাছে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একটা আলোচনা চলছে। অভিযুক্ত তৃণমূল নেত্রীকে গ্রেফতারের দাবিতে জেলা সদরেও বিক্ষোভে নামার লক্ষ রয়েছে আমাদের।” সিপিএম অবশ্য ঘটনাটিকে কেন্দ্র এলাকায় তৃণমূলের ভাবমূর্তি খারাপ করতে হাটে, বাজারে, চা দোকানে সাধারণ মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলোচনার পথে হাঁটছে। এক সিপিএম নেতার কথায়, লোকসভা ভোটে বুথ ভাঙচুর, পুরভোটে বহিরাগত এনে সন্ত্রাস চালানো, ও সব শেষে পুতুল-কাণ্ড। এই সবের জেরে বিধায়ক দীপালিদেবীর বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ তুঙ্গে। সিপিএম এই ক্ষোভটিকেই ভিতরে ভিতরে উস্কে দিচ্ছে। ওই সিপিএম নেতার কথায়, “আমরা চাই সামনের বিধানসভা ভোটে দীপালিদেবীই তৃণমূলের টিকিট পান। আর ততদিন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ জিইয়ে রাখাই আমাদের চ্যালেঞ্জ। ফলে ওঁকে প্রার্থী করা হলে মানুষের ক্ষোভই তাঁকে হারিয়ে আমাদের প্রার্থীকে জিতিয়ে দেবে।’’
তবে প্রকাশ্যে সিপিএম নেতারা এ নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন। সোনামুখীর বাসিন্দা দলের জেলা কমিটির সদস্য তথা জেলা পরিষদের বিরোধী দলনেতা সুব্রত মুখোপাধ্যায় বলেন, “অত্যন্ত নিন্দনীয় ঘটনা। এলাকার সিপিএম নেতৃত্ব নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে গিয়ে দেখা করে এসেছেন। আমরা ওই পরিবারের সঙ্গে রয়েছি।” এ দিনও দলীয় নেতৃত্বের নির্দেশে মন্তব্য করতে চাননি দীপালিদেবী।