চারুদত্তের ছেলের মাটির খেলনা গাড়িটি নিজের অলঙ্কারে ভরিয়ে দিয়েছিলেন বসন্তসেনা। শূদ্রকের সেই মৃচ্ছকটিকম খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের নাটক বলে অনেকের অনুমান।
সেই নাটকের খবর কি পৌঁছেছিল তাম্রলিপ্ত বন্দরের কাছাকাছি বৌদ্ধ বিহার সংলগ্ন জনপদেও?
পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতনের কাছে মোগলমারিতে মাটির নীচে থেকে যে বৌদ্ধ বিহারটি পাওয়া গিয়েছে, তার কাছ থেকেই এ বার মিলল মাটির খেলনা গাড়ির চাকা। সেই সঙ্গেই পাওয়া গিয়েছে গুলতির বল, পাশার ঘুঁটি, পুঁতি এমনকি কিতকিত খেলার চাকতিও। সব ক’টিই পোড়ামাটির। সেগুলি খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ-সপ্তম শতকের বলে অনুমান পুরাতত্ত্ববিদ প্রকাশচন্দ্র মাইতির। তাঁর নেতৃত্বেই এখন মোগলমারিতে উৎখননের কাজ করছে রাজ্য পুরাতত্ত্ব দফতর। মোগলমারিটির এই বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠান থেকে মিলেছে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ-সপ্তম শতকের মিশ্র ধাতুর মুদ্রা, সোনার অলঙ্কার, গুপ্ত পরবর্তী ব্রাহ্মী অক্ষরের শিলমোহর। এখান থেকে হাতির দাঁতের, পাথরের এবং মাটির পুঁতি পাওয়া গিয়েছে।
এই পুরাবস্তুগুলি থেকে বোঝা যায়, মোগলমারির বিহারটিকে ঘিরে খ্রিস্টীয় পঞ্চম-ষষ্ঠ শতক থেকেই সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। গুপ্ত যুগের সামান্য পরে সে সময় বন্দরটি ঘিরে এই এলাকার গুরুত্ব বাড়ছিল। চিনা পরিব্রাজক জুয়াং জ্যাং বা হিউয়েন সাংও এই এলাকায় কিছু বড় বৌদ্ধ বিহার দেখেছিলেন বলে উল্লেখ করেছিলেন। এটি তারই অন্যতম বলে মনে করতেন প্রয়াত পুরাতত্ত্ববিদ অশোক দত্ত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব দফতরের প্রাক্তন প্রধান অশোকবাবুই খনন করে বিহারটির সন্ধান পেয়েছিলেন।
পুরাতত্ত্ববিদদের অনুমান, বিহারটি এতই বড় ছিল যে, এই এলাকার গার্হস্থ্য জীবনও তার উপরে কিছুটা নির্ভর করত। ওই জনপদে পাশা খেলা হত। গুলতি নিয়ে খেলত বাচ্চারাও। পুরুষ-মহিলা সকলেই পুঁতি দেওয়া হার পরতেন। প্রকাশবাবু জানান, যেখান থেকে এই খেলনা গাড়ির চাকা, গুলতির বলগুলি পাওয়া গিয়েছে, তা মূল বিহারটির একেবারে গা লাগোয়া এলাকা। তিনি বলেন, ‘‘তাই অনুমান করি, বিহারটিকে ঘিরে যে জনপদ ছিল সেখানে খোলামেলা আবহাওয়াই ছিল। বৌদ্ধদের বিহারের ভিতরের কড়া অনুশাসন বাইরে মানতে হত না। কিন্তু বাইরের লোক বিহারের গা ঘেঁষেই থাকতে পারতেন।’’
প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক রূপেন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘মোগলমারি থেকে এখনও পর্যন্ত যা যা পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে, তা থেকে একটি প্রাণবন্ত সমাজের পরিচয়ই মিলেছে। এই জনপদ অতি অবশ্যই তাম্রলিপ্ত বন্দরের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বাণিজ্য পথের একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র ছিল। যেটি বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছিল। যে কারণে নানা জায়গা থেকে মানুষ এখানে আসতেন। তাতে নানা সংস্কৃতির আদান-প্রদান ঘটত।’’
সে কারণেই এখান থেকে মাত্র কিছু দিন আগেই প্রায় শ’খানেক প্রাচীন ধাতব মূর্তি পাওয়া গিয়েছে। মূর্তিগুলি কোনও কারণে লুকিয়ে ফেলতে হয়েছিল। কিন্তু এত মূর্তি এখানে জোগাড় করে আনার মধ্যে থেকেও বোঝা যায়, এলাকাটির গুরুত্ব কতটা ছিল।
চোদ্দোশো বছর আগে এমন জমজমাট এক জনস্থানের কোনও বাড়িতে কি চারুদত্তের ছেলের মতোই কোনও বালক মাটির খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলত? তার গাড়ি কি বসন্তসেনার মতোই কেউ সোনা ও রত্নের অলঙ্কারে ভরিয়ে দিত? অথবা, উজ্জয়িনীর নাটকের খবরই বয়ে এসেছিল সুদূর অবন্তী থেকে? শূদ্রকের নাটকে বসন্তসেনাকে রক্ষা করেছিলেন এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীই।