Advertisement
E-Paper

শাসকের হাত মাথায়, তাই দাপট অনুকূলের

গ্রিল ফ্যাক্টরিতে কাজ পাওয়ার পরেই রাত করে বাড়ি ফেরা শুরু। এলাকার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা শুরু পরে, বাড়তে থাকে ‘দাপট’। তার জোরেই থানায় অভিযোগ দায়ের হলেও, গ্রেফতার তো দূরের কথা, উল্টে অভিযোগকারিণীকেই ধমকে দেন পুলিশের এক কর্মী।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০২:৫০
হাসপাতালে ভর্তি ছাত্রীর কাছে পুলিশকর্মী। ছবি: রাজকুমার মোদক।

হাসপাতালে ভর্তি ছাত্রীর কাছে পুলিশকর্মী। ছবি: রাজকুমার মোদক।

গ্রিল ফ্যাক্টরিতে কাজ পাওয়ার পরেই রাত করে বাড়ি ফেরা শুরু। এলাকার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা শুরু পরে, বাড়তে থাকে ‘দাপট’। তার জোরেই থানায় অভিযোগ দায়ের হলেও, গ্রেফতার তো দূরের কথা, উল্টে অভিযোগকারিণীকেই ধমকে দেন পুলিশের এক কর্মী।

এক সময়ে সন্ধে নামার পরেই বাড়ি ফিরে আসত যে ছেলে, তার এখন গভীর রাতে মোটরবাইকে চেপে বাড়ি ফেরা অভ্যেস। অনুকূলের নিজের মোটরবাইক নেই, রোজই কারও না কারও মোটরবাইকের পিছনে বসে বাড়ি ফিরত। কোনও কোনও দিন ভোর রাতে গ্রামের নিস্তবদ্ধতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত মোটরবাইকের শব্দে। শোনা যেত বেসামাল পায়ের শব্দ। পড়শিরা টের পেতেন, অনুকূল ঘরে ফিরল। সোমবার বিকেলে পড়শি এক মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছাত্রীকে মারধর, শ্লীলতাহানির অভিযোগের মূল পান্ডা অনুকূল মণ্ডলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বছর পঁচিশের অনুকূলকে বাড়ি থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পরে, পড়শিদের একাংশ দাবি করেছেন, এমন পরিণতি যে একদিন হবে তা আঁচ করতে পেরেছিলেন সকলে। ছাত্রীটিকে রাস্তায় দেখলেই অনুকূল পিছু নিত বলে অভিযোগ। কোনও দিন হাত টেনেও ধরত। অভিযোগ, বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায়, মাস কয়েক আগে ছাত্রীর বাড়ি বয়ে গিয়ে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকিও দিয়ে গিয়েছিল অনুকূল।

বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, এমনিতে সাধারণ কৃষক পরিবারের ছেলে হলেও, গ্রিল ফ্যাক্টরির কাজে ঢুকেই ‘পরিবর্তন’ শুরু অনুকূলের। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা অনুকূল একসময়ে সাইকেল নিয়ে পুরো গ্রামে দাপিয়ে বেড়ালেও, বছরখানেক ধরে মোটকবাইক ছাড়া চড়তে চাইত না বলে পড়শিদের দাবি। ছাত্রীকে উত্যক্ত করার ঘটনা পাড়া পড়শিরা জানতেন। একজনের কথায়, ‘‘ওকে একবার এমন করতে না করেছিলাম।’’ তাঁর দাবি, সে কথা তাচ্ছিল্যে উড়িয়ে দিয়েছিল অনুকূল। উল্টে দাবি করেছিল, ‘‘আমাকে কেউ কিছু করতে পারবে না। আমার অনেক চেনা আছে।’’ এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, বছর দুয়েক আগে এলাকার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায় সে। সে সুবাদেই গত বছর অনুকূলের বিরুদ্ধে ওই ছাত্রীর বাড়ি গিয়ে মারধরের অভিযোগ থানায় দায়ের হলেও, পুলিশ তাকে ধরেনি বলে প্রতিবেশীদের অভিযোগ। উল্টে ছাত্রীর অভিযোগ, অনুকূলের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করায় এক পুলিশ কর্মীই তাঁকে ধমক দিয়েছিলেন। পাড়ার ছেলের এমন ‘প্রভাবে’র কথা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে অনুকূলকে সকলেই সমঝে চলতেন। অভিযোগ, তার জেরেই দিনদিন বাড়তে থাকে অনুকূলের ঔদ্ধত্য।

Advertisement

এ দিন অবশ্য গ্রেফতারের পরে ধূপগুড়ি থানার হাজত থেকেই অনুকূল চেঁচিয়ে বলতে থাকে, ‘‘আমি কোনও অপরাধ করিনি। ঘটনার সময়ে ছিলামই না। কোনও দলও করি না। আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে।’’ ধূপগুড়ির তৃণমূল নেতারাও দাবি করেছেন, অনুকূল যে তাঁদের দলের কর্মী বা সমর্থক তেমন কিছু তাঁদের জানা নেই।

নিগৃহীতা মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর বুকে, পেটে, পিঠে চোট লেগেছে। তার শারীরিক পরিস্থিতি আপাতত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। গাছে বেঁধে আধঘণ্টা ধরে মারধর-হুমকি সহ্য করে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিল ছাত্রীটি। হাসপাতালে ভর্তি করানোর প্রায় আধঘণ্টা পরে হুঁশ ফেরে। মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী জেনে প্রথমেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে আলাদা ঘরে রেখেছিলেন। হুঁশ ফেরার পরে প্রথমে ছাত্রী ভাবে তাকে বুঝি পরীক্ষাকেন্দ্রের ‘সিক রুমে’ রাখা হয়েছে। স্যালাইনের বোতল, নার্স, চিকিৎসক দেখে হাসপাতালের ঘর বুঝতে পারে। গত বছর মাধ্যমিকে পাশ করতে পারেনি। শেষ পরীক্ষা না দিলে এ বারেও পাশ করা হবে না বলে আশঙ্কা চেপে বসে। হাসপাতালের এক কর্মী বলেন, ‘‘হুঁশ ফিরতেই মেয়েটা বিছানায় উঠে বসে খাতা পেন চাইল, বলল, আমি পরীক্ষা দেব।’’ সে সময়ে ছাত্রীর স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা হাসপাতালেই ছিলেন। তাঁরাই পর্ষদে ফোন করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। প্রধান শিক্ষক অমিত দে’র কথায়, ‘‘মনের অসম্ভব জোর না থাকলে, এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় পরীক্ষা দিতে চাওয়া সম্ভব নয়।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy