সন্ধ্যার শো দেখতে এসেছিলেন দুই বন্ধু তন্ময় চৌধুরী আর দীপাঞ্জন মাইতি। শো শুরু সাতটায়। কিন্তু ছ’টায় হলে পৌঁছে দেখেন উপচে পড়ে ভিড়। কাউন্টারের সামনে লাইন দেখেও দাঁড়িয়ে পড়েন। অবশ্য বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি। তন্ময় বলছিলেন, “পিছন থেকে এমন একটা ধাক্কা এলো আমরা লাইন থেকে ছিটকে গেলাম! সেই যে বেরিয়ে গেলাম, আর লাইনে ঢুকতে পারলাম না! এত ভিড়!”
মেদিনীপুর শহরের সিনেমা হলে শেষ কবে এমন ভিড় দেখা গিয়েছে মনে করতে পারছেন না হলকর্মী থেকে শহরের সিনেমামোদী কেউই। শাহরুখ-কাজল জুটির কামব্যাক ছবি ‘দিলওয়ালে’-র কল্যাণেই এই দিনবদল। শহর মেদিনীপুরে আগে তিনটি সিনেমা হল ছিল। দু’টি বন্ধ হয়েছে। একমাত্র বল্লভপুরের হরি সিনেমাই চালু রয়েছে। গত শুক্রবার মুক্তি পেয়েছে ‘দিলওয়ালে’। সে দিন থেকেই হল চত্বরে চোখে পড়ছে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। এই সিনেমাহলে মোট আসন সংখ্যা সাতশো। গড়ে প্রতিটি শোয়ে পাঁচশো দর্শক হচ্ছেই। অথচ অন্য হিন্দি বা বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে মেরেকেটে গড়ে ৫০ থেকে ৮০ জন দর্শক হয়। কোনও কোনও ছবির ক্ষেত্রে তা-ও হয় না।
সেই ১৯৭৬ সাল থেকে হরি সিনেমা হলে কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন প্রবীণ তাপস সাউ। তিনিও বলছেন, “ফের শাহরুখ-কাজল জুটি বড় পর্দায়। দর্শক হবেই। আগামী বেশ কিছু দিন ছবিটা দর্শক টানবে বলেই মনে হয়।” তাপসবাবু আরও জানালেন, টিকিটের জন্য এই হাহাকার অনেক দিন দেখা যায়নি। ডন-টু আর ধুম-থ্রি’তে ভিড় হয়েছিল। তবে এত নয়। মাঝেমধ্যে হলে গিয়ে সিনেমা দেখেন দীপাঞ্জনরা। তাঁদেরও অভিজ্ঞতা, সব ভিড়কে টেক্কা দিয়েছে গত শুক্রবার রাতের ভিড়। যেখানে সিনেমাহল, সেই বল্লভপুরে বাড়ি সঞ্জিত সরকারের। তিনিও বলেন, “অনেক দিন পর এত ভিড় হল। সিনেমা নিয়ে এত হইচই গত বেশ কয়েক মাসে পাড়ার হলে দেখিনি।”
এমনিতে শহরে মাত্র একটি সিনেমা হল। তার উপর তিনটি শোয়ে একই ছবি দেখানো হয়। ফলে, মেদিনীপুরের সিনেমাপ্রেমীরা শহরের হলে পছন্দের ছবি দেখার সুযোগ পান খুব কম। কলেজ পড়ুয়া সায়ন দে, অভিষেক দত্তদের আক্ষেপ, “শহরে মাত্র একটা সিনেমা হল। মাল্টিপ্লেক্স তো নেই। ভাবা যায়!” সিনেমা ব্যবসার সঙ্গে যাঁরা যুক্ত রয়েছে, তাঁদের অবশ্য ব্যাখ্যা, ইন্টারনেট, ইউটিউব আর অবৈধ ডিভিডির রমরমায় মার খাচ্ছে সিনেমা হল। অনেকেই হল চালাতে পারছেন না। সিনেমা হলের পরিকাঠামো নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। দর্শকরা অনেকেই বলছেন, ভিড় টানতে হলে জেলার হলগুলোর আধুনিকীকরণ প্রয়োজন। ভাল সাউন্ড সিস্টেম, ফুড কোর্ট করতে হবে।
শাহরুখ-কাজ জুটি অবশ্য বারবারই মফস্সলের দর্শককেও হলমুখী করেছে। তা সে ১৯৯৩ সালের ‘বাজিগর’ হোক বা ’৯৫ তে মুক্তি পাওয়া ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে’ কিংবা ’৯৮ সালের ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’। ২০০১-এ মুক্তি পাওয়া ‘কভি খুশি কভি গম’ও সাড়া ফেলেছিল। এই সিনেমাগুলো শহরের যে হলে রমরমিয়ে চলেছে, সেই মহুয়া সিনেমাহল এখন আর নেই। ২০১০-এ মুক্তি পাওয়া এই জুটির কামব্যাক সিনেমা ‘মাই নেম ইজ খান’ অবশ্য এই হরি সিনেমাহলেই মুক্তি পেয়েছিল। হলের এক কর্মীর কথায়, “শাহরুখ-কাজল জুটির সেই সিনেমাটাও খারাপ চলেনি। তবে ‘দিলওয়ালে’ আরও হিট।”
হিটের বহর দেখা গেল শনিবার রাতেও। ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করেই জমেছিল ভিড়। সিনেমা চলাকালীন ঘনঘন বাজছে সিটি, হাততালিতে ফেটে পড়ছে হল। ছবি দেখে বেরোনো দর্শকদের মধ্যে অবশ্য মিশ্র প্রতিক্রিয়াই রয়েছে। যেমন অয়ন ঘোষ, শ্রাবণী করদের কথায়, “গল্পটা খুব ভাল নয়। যে ছবিতে শাহরুখ-কাজল রয়েছে, সেই ছবি ঘিরে প্রত্যাশা একটু বেশিই থাকে। ছবিটা ডিডিএলজি- র মতো হয়নি!” আবার শান্তনু রায়, অপর্ণা মুখোপাধ্যায়দের কথায়, “রোহিত শেট্টির সিনেমা তো আর যশ চোপড়ার মতো হবে না! ফাটাফাটি অ্যাকশন রয়েছে। রোমান্স রয়েছে। আর দুর্দান্ত অভিনয়।”
হলের সামনে বড় পোস্টারে মালা ঝুলছে। লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটছেন শাহরুখ-কাজলের ভক্তরা। রাজীব আহমেদ, অনিন্দিতা মহাপাত্ররা বলছেন, “ছবির কয়েকটা সিকোয়েন্স ডিডিএলজি-র কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। একটা নস্টালজিক ব্যাপার রয়েছে! শাহরুখ- কাজলের ছবি মিস করার প্রশ্নই ওঠে না! ফার্স্ট ডে ফাস্ট শো-ই দেখেছি!”