টানা অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আসানসোল জেলা হাসপাতালের কোনও ডাক্তার বা নার্স ছুঁয়েই দেখেননি অঙ্কুরকে। যদি দেখতেন, তা হলে তাঁরা আঁচ পেতেন, কোথাও একটা বড়সড় গোলমাল হয়ে গিয়েছে। সেই গোলমালের উৎসটা তাড়াতাড়ি খুঁজে পাওয়া গেলে আড়াই মাস বয়স থেকেই প্রতিবন্ধীর তকমাটা জুটত না ওই শিশুর। বাদ যেত না তার ডান হাত!
শিশুটির আত্মীয়-পরিজনের অভিযোগ নয়। এসএসকেএমে হাসপাতালের অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরাই অঙ্কুর শীটকে পরীক্ষা করে তাঁদের ওই পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছেন। কোনও হাসপাতালে প্রশিক্ষিত ডাক্তার-নার্সদের সামনে কী ভাবে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, সে নিয়েও তাঁরা বিস্মিত। তাঁদের পর্যবেক্ষণ পৌঁছেছে স্বাস্থ্যকর্তাদের কাছেও। তাঁরা খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, ওই সময়ে আসানসোল হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে এমন কিছু রোগীর চাপ ছিল না। তাই চাপের তত্ত্ব সাজিয়ে রোগীদের দিকে নজর দিতে না পারার যুক্তি অন্তত কোনও ভাবেই খাড়া করা যাবে না।
প্রাথমিক ভাবে স্বাস্থ্যকর্তাদের মনে হয়েছে, এই ঘটনা আদ্যোপাম্ত ভাবে গাফিলতিরই নমুনা। তদন্ত শুরু করার পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালে কী ভাবে ডাক্তার-নার্সদের আরও সহানুভূতিশীল, আরও মানবিক করে তোলা যায়, তা নিয়ে রাজ্য জুড়ে কর্মশালা শুরু করার কথাও ভাবা হচ্ছে। আসানসোল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই নিজেদের মতো করে একটি তদন্ত কমিটি তৈরি করেছিল। সেই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য ভবনে পৌঁছয়।
স্বাস্থ্য অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথী জানিয়েছেন, তাঁরা ওই রিপোর্টে সন্তুষ্ট নন। তাই দফতর থেকে আর এক উচ্চপদস্থ আধিকারিককে ফের ঘটনার তদন্তে পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার তিনি রিপোর্ট জমা দেবেন। বিশ্বরঞ্জনবাবু বলেন, ‘‘হাসপাতাল যে রিপোর্ট দিয়েছে তা অসম্পূর্ণ। কার কার গাফিলতি ছিল ওই ঘটনায়, তা নিশ্চিত ভাবে জানাতে হবে। তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ব্যবস্থা নেব।’’
এ দিনও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসএসকেএম কর্তাদের কাছে অঙ্কুরের বিষয়ে খোঁজখবর নেন। চিকিৎসায় যাতে কোনও রকম ত্রুটি না থাকে, সে ব্যাপারেও নির্দেশ দেন তিনি।
রানিগঞ্জের বাসিন্দা অঙ্কুরকে নিউমোনিয়া নিয়ে ২৬ জানুয়ারি আসানসোল হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। আত্মীয়দের দাবি, তাকে দেখেই হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলে দেন, ‘বাচ্চার বাঁচার অবস্থা নেই।’ ওই দিনই বিকেলে রক্ত নেওয়ার জন্য অঙ্কুরের ডান হাতে রবারের নল (টুর্নিকেট) বাঁধা হয়। টানা দু’দিন সেটি খোলা হয়নি। ফলে, কনুইয়ের নীচে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে গ্যাংগ্রিন হয়ে গিয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। তাকে এসএসকেএমে রেফার করা হয় ২৯ তারিখ। মঙ্গলবার শিশুটির কালো হয়ে যাওয়া ডান হাত কনুইয়ের নীচ থেকে অস্ত্রোপচার করে বাদ দেওয়া হয়।
এ দিন অঙ্কুরের পিসেমশাই সুশান্ত মণ্ডল জানান, বাচ্চাটির হাতের তালু কালো হয়ে গিয়েছে দেখে পরিবারের তরফে কর্তব্যরত নার্সকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি এক চিকিৎসককে সমস্যার কথা জানান। কর্তব্যরত চিকিৎসক ‘মলম’ লিখে দেন। অভিযোগ, নার্সদের মলম লাগিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেও বিশেষ লাভ হয়নি। এর পর সুশান্তবাবু অঙ্কুরের জামা খুলে দেখেন, ডান হাতে টুর্নিকেটটি তখনও বাঁধা। সেটা জেনে নার্স দ্রুত তা খুলে ফেলেন। সুশান্তবাবুর কথায়, ‘‘এ বার এক ডাক্তার এসে অঙ্কুরকে পরীক্ষা করে বলেন, হাতটা আর বাঁচানো যাবে না। তবে ছ’ঘণ্টা আগে এলে হয়তো কিছু করা যেত।’’ পরিবারের লোকজনের প্রশ্ন, দিনভর ডাক্তার, নার্সরা ঘুরছেন ওয়ার্ডে। তাঁরা কেন খেয়ালই করলেন না বিষয়টি?
দিনভর এসএসকেএম চত্বরে বসে থাকেছেন অঙ্কুরের বাড়ির লোকেরা। সংক্রমণের ভয়ে পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে মা ছাড়া অন্য কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। অঙ্কুরের বাবা জয়ন্ত শীট বলেন, ‘‘একরত্তি ছেলেটা এত কষ্ট পাচ্ছে, আমরা কিছুই করতে পারছি না। যারা ওর কষ্টের জন্য দায়ী, তারা যেন শাস্তি পায়। না হলে এই অবহেলা, এই গাফিলতি চলতেই থাকবে।’’