বেগুন, টাকি মাছ আর আলুর ভর্তা আগেই এসেছে। এর পর সঙ্গী স্থানীয় বন্ধুর নির্দেশে এল কালো জিরে ভর্তাও। দেখতে একটি কালো রংয়ের গোল্লা, ভাতে মাখলেও তার রং একই! কিন্তু স্বাদে অভিনব! সঙ্গে করলা আর লাউয়ের ভাজি।
রাত এগারোটার কাঁটা ছাড়িয়ে গিয়েছে কিন্তু গুলশন (এক)-এর এই ‘ধানসিড়ি’ রেস্তরাঁর ভর্তা, ভাজি পুলাওয়ের দোকানে ভিড় যথেষ্ট। পিছনে রংপুর চায়ের দোকানও উপচে পড়ছে মাল্টা চা, রং চা পান করতে। আগে নাকি গভীর রাত পর্যন্ত এই সব দোকান খোলা থাকত, বর্তমানে বারোটার পর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
গুলশনেরই সাউথ রোডের এক মাথা থেকে ঢাকার নতুন বাজার অঞ্চলে পায়ে হেঁটে যাতায়াতে খিদেও পেয়েছিল জব্বর। রাস্তার প্রাণচঞ্চলতা আর আলোময় বিপণি দেখতে গিয়ে খেয়ালও ছিল না, আমি ঢাকা পৌঁছনোর রাতেই তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজার এলাকায় বিএনপির অঙ্গসংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে প্রকাশ্য রাজপথে গুলি করে মেরেছে আততায়ী। ইনকিলাব মঞ্চের ভারত-বিরোধী নেতা ওসমান হাদির মৃত্যুর পর থেকে যে ধারাবাহিক হত্যালীলা চলছে বাংলাদেশে, তার সঙ্গে তেজাতুরী বাজার হত্যার কোনও সম্পর্ক নেই— এমনটাই সরকারি বয়ান। কিন্তু শহরের এই বাহ্যিক প্রাণচঞ্চল রূপের ভিতরে যে আতঙ্কের স্রোত বইছে, তা টের পেতে এমনিতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
ইসমাইল নামের শান্ত মুখের যে অল্পবয়সী ছেলেটি পরিবেশন করছিলেন, তিনি বলেন, ‘‘সব বাড়িতে একটা করে আওয়ামী লীগের সমর্থক রয়েছে এখনও। কিন্তু একেবারেই গা ঢাকা দিয়ে। আর আমরা আগে কাজ গুটিয়ে মাঝ রাতে আরাম করে বাড়ি ফিরতাম এক কিলোমিটার হেঁটে। গল্প করতে করতে দিব্যি চলে যেতাম। এখনও যেতে তো হয়ই। তবে অনেকটা আগে আমরা বেরিয়ে যাই, মাঝ রাত করি না। মনে ডর খুবই। কখন কী ঘটে যায়, তা বলা তো যায় না।’’
আতঙ্ক এবং স্বাভাবিকতা— এই দুই পরস্পর বিরোধী স্রোতের মধ্যে সাঁতার কাটছে আজকের বাংলাদেশে। নির্বাচনের আগে এই সন্ধিসময়ে দাঁড়িয়ে খালি চোখে যা দেখছি, ভোট বাজারে বিএনপি-র চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর, ক্রমশ বাড়ছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর শোক গোটা শহরকে পোস্টার করে মুড়ে রেখেছে। যদিও এই আবেগে এ বারের ভোট হচ্ছে না, এ কথা স্পষ্ট। কিছু দৃশ্যমান এবং কিছু অদৃশ্য বিষয় আগামী ফেব্রুয়ারির ভোটের ভাগ্য নির্ধারিত করবে বলেই মনে করছেন বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞরা। বিএনপি-র মূলধন তাদের গ্রামাঞ্চলে তৃণমূলস্তরের সমর্থনের পুরনো ভিত্তি, সতেরো বছর পরে ফিরে আসা তারেকের বক্তব্যে পরিণতি ও ভারসাম্যের ছাপ (যা এই অস্থির বাংলাদেশে প্রলেপের কাজ করছে), আওয়ামী লীগের ভোটারদের সঙ্গে পাওয়ার সম্ভাবনা, সাড়ে আট শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটের আশা। এখনও পর্যন্ত হওয়া সমীক্ষাগুলিও বিএনপি-র হয়েই কথা বলছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট’-এর সমীক্ষায় ৩০০টি সংসদীয় আসন থেকে ২০ হাজারের বেশি মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। ৭০ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তাঁরা বিএনপির পক্ষে। শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত, হাতে গোনা কিছু ছাত্র নেতা বাংলাদেশের নবগঠিত দল এনসিপির সদস্য। এনসিপির হাসনাত আবদুল্লা-সহ বহু নেতার কণ্ঠে সাম্প্রতিক সময়ে কট্টর ভারত-বিরোধিতার সুর শোনা যায়। সেই এনসিপির সমর্থনে বাংলাদেশের মাত্র ২.৬ শতাংশ মানুষ রয়েছেন। জামায়েতে ইসলামীকে ভোট দেওয়ার পক্ষে রয়েছেন ১৯ শতাংশ মানুষ। বিএনপি জিতে এলে যাঁর বাণিজ্যমন্ত্রী হওয়ার খবর বাতাসে ভাসছে, খালেদা-ঘনিষ্ঠ নেতা ও ব্যবসায়ী আবদুল আওয়াল মিন্টু জানাচ্ছেন, ‘‘একটা শক্তিশালী গোষ্ঠী চায় না যথা সময়ে নির্বাচন হোক। অনির্বাচিত সরকার থাকলে তাদের করেকম্মে খেতে সুবিধা। যে ভাবে দেশ এখন অরাজকতার মধ্যে দিয়ে চলছে, তাতে তারা সুবিধাই পাচ্ছে।’’ বিএনপি-র একটা অংশ মনে করছে, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের মূল স্রোতে নিয়ে এলে তা গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গল। মিন্টুর কথায়, ‘‘আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর বক্তৃতায় বলেছেন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে জাতিগঠনের কথা। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এখনও একটা শব্দও বলেননি। না, ভারত বিরোধিতা করেছেন। অতীতে জিয়াউর রহমানও সবাইকে নিয়ে দেশ গড়েছিলেন।’’ তাঁর কথায়, ওসমান হাদির মৃত্যুর দায় বিএনপি-র ঘাড়ে ঠেলা এবং বিভিন্ন হত্যা ও বিশৃঙ্খলতা চালিয়ে যাওয়া বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ। এটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, বিএনপি নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলে জামাতের কথামতো তাদেরকে ‘ইউনিটি সরকার’ বা জোট সরকারে সামিল করতে চাইবে না, নেহাত বিপাকে না পড়লে।
তার একটা কারণ হয়তো সংখ্যালঘু ভোটের প্রতি বিশেষ যত্নবান হয়েছে তারেকের দল। সংখ্যালঘুদের জামাতকে ভোট দেওয়া আর মুসলমানদের বিজেপি-কে ভোট দেওয়া আজ কিছুটা একই রকম। মানিকগঞ্জের সাংসদ তথা প্রাক্তন শিল্পমন্ত্রী (খালেদা জমানায়) সামসুল ইসলাম খানের পুত্র মঈনুল ইসলাম খান শান্ত প্রত্যেক দিন প্রচার বৈঠক করছেন হিন্দু প্রধান এই এলাকার বিভিন্ন পুজো কমিটির কর্তাদের সঙ্গে। বিএনপি জিতলে তাঁরও মন্ত্রিসভায় যাওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট। প্রচার ব্যস্ততার মধ্যে সময় করে বলছেন, ‘‘এখানে মাঝিপাড়ার পৌষ সংক্রান্তি মেলায় দাওয়াৎ দেন হিন্দুরা, কিন্তু উৎসবে মাতেন মুসলমানেরা। সবাইকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে দেখি। এই মানুষগুলি উন্নয়ন চাইতেন। এখন বলেন, শান্তিতে ঘুমোতে চাই। আমার নির্বাচনী এলাকায় বহু মানুষ রয়েছেন, যাঁরা সৎ এবং পরিশ্রমী। কিন্তু তাঁদের গায়ে আওয়ামী লীগের ছাপ রয়েছে। বিপদে পড়ে আমাদের কাছে আসছেন, তাঁদের সঙ্গে নিয়েই চলছি। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার রাজনীতিতে বিএনপি বিশ্বাস করে না।’’
(চলবে)
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)