×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২১ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

প্রস্তুতি শেষ বিচ্ছেদের, গানে বিদায়বার্তা ইইউ-র

শ্রাবণী বসু
লন্ডন ৩১ জানুয়ারি ২০২০ ০৬:৪৬
হাতে-হাত: গান গাইছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা। বুধবার ব্রাসেলসে। এএফপি

হাতে-হাত: গান গাইছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা। বুধবার ব্রাসেলসে। এএফপি

চোখে জল। মুখে ‘পুরানো সেই দিনের কথা’। এটাই বুধবার সন্ধেতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ব্রেক্সিট-চিত্র।

গত কাল সন্ধেবেলা ইউরোপীয় পার্লামেন্টে পাশ হয়ে গেল ব্রেক্সিট বিল। যার ফলে ৩১ জানুয়ারি স্থানীয় সময় রাত ১১টায় (ব্রাসেলসে রাত ১২টায়) ২৮টি রাষ্ট্রের সমষ্টি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বার হয়ে যাওয়ায় আর সত্যিই কোনও বাধা রইল না।

৬৮৩ সদস্যের ইউরোপীয় পার্লামেন্টে কাল এই বিলের পক্ষে ৬২১টি ভোট পড়েছে। বিপক্ষে মাত্র ৪১টি। ২১ জন সদস্য ভোট দেননি। বিল পাশ হওয়ার পরে বেলজিয়ামের মেম্বার অব দ্য পার্লামেন্ট (এমইপি) গাই ফেরহফস্টাট ব্রিটিশ সদস্যদের উদ্দেশে রসিকতা করে বলেন, ‘‘আপনারা দারুণ একরোখা। ২.৫৪ সেন্টিমিটার (এক ইঞ্চি) জায়গা দিলে ১৬০৯ মিটার (এক মাইল) আদায় করে বসেন।’’ তারপরেই অবশ্য ব্রিটেনকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফেরহফস্টাটের মন্তব্য, ‘‘আমরা কৃতজ্ঞ, আপনারা আমাদের দু’-দু’বার স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। রক্ত দিয়ে স্বাধীন করেছেন আমাদের।’’ কূটনীতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দু’টি বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের ভূমিকার কথাই স্মরণ করেছেন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ।

Advertisement

ফেরহফস্টাটের বলা শেষ হলেই উঠে দাঁড়ান বেশ কয়েক জন (এমইপি)। হাত ধরে গাইতে শুরু করেন— ‘অল্ড ল্যাঙ সাইন’...পুরানো সেই দিনের কথা। রবার্ট বার্নসের লেখা এই স্কটিশ গানের অনুপ্রেরণাতেই বাংলা গানটি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তখন অনেক পার্লামেন্টে সদস্যেরই চোখে জল।

সেই আবেগঘন মুহূর্তের রেশ কেটে যায় অবশ্য একটু পরেই। ফ্রান্সের প্রাক্তন ইউরোপীয় মন্ত্রী নাতালি লুসো ব্রিটিশ সদস্যদের বলেন, ‘‘আপনাদের উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে। আপনাদের ভবিষ্যেতর চাবি এখন আপনাদেরই হাতে। সব কিছুর দায়িত্ব এ বার আপনাদেরই নিতে হবে। ব্রাসেলসের উপর দায় চাপাতে পারবেন না।’’

ইউরোপীয় কমিশনের নতুন প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লিয়েনের বক্তব্যে অবশ্য তেমন কোনও ‘যুদ্ধং দেহি’ মনোভাব ছিল না। ব্রিটিশ ওপন্যাসিক জর্জ এলিয়টকে উদ্ধৃত করে উরসুলা বলেন, ‘‘বিচ্ছেদের সময়েই বোঝা যায়, ভালবাসা কত গভীর ছিল।’’

এ দিনর অধিবেশনে বেশ বেসুরে বেজেছেন ব্রিটিশ এমপি নাইজেল ফারাজ। ব্রিটেনের ব্রেক্সিট পার্টির এই নেতা তাঁর ব্যাঙ্গাত্মক বিদায়ী ভাষণে বলেন, ‘‘৪৭ বছরের রাজনৈতিক গবেষণা শেষ হল। ব্রিটেন অবশ্য কখনওই খুশি মনে এই গবেষণায় অংশ নেয়নি। আমরা এক বার বেরিয়ে গেলে আর কখনও ফেরার কথা ভাবব না।’’ এই সব বলে ফারাজ ও তাঁর দলের আরও ডজন দু’য়েক এমইপি নারা রকম অঙ্গভঙ্গি করে ব্রিটেনের জাতীয় পতাকা দোলাতে থাকেন। পার্লামেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট মেরিড ম্যাকগিনেস তাঁদের সতর্ক করে বলেন, ‘‘সংযত হন। আপনারা বেরিয়ে যাচ্ছেন, আপনাদের পতাকাও সঙ্গে করে নিয়ে যান।’’

২০১৬-র ২৩ জুন গণভোট দিয়ে ব্রিটেন ঠিক করেছিল, ইইউ ছেড়ে যাবে তারা। তার পরে সাড়ে তিন বছর কেটে গিয়েছে। যে ডেভিড ক্যামেরনের জমানায় গণভোট হয়েছিল, তিনি ইস্তফা দেওয়ার পরে প্রথমে টেরেসা মে এবং পরে বরিস জনসন ১০, ডাউনিং স্ট্রিট দখল করেছেন। অসংখ্য বার ব্রেক্সিট বিল নিয়ে আলোচনায় ও বিতর্ক হয়েছে ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টে। শেষ পর্যন্ত আর কয়েক ঘণ্টা পরেই সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত উপস্থিত হবে। প্রধানমন্ত্রী জনসন চেয়েছিলেন, রাত ১১টার সময়ে বিগ বেন বেজে উঠবে। কিন্তু সারাই হচ্ছে ঐতিহাসিক ক্লক টাওয়ারে। ফলে পার্লামেন্ট স্কোয়্যারেই বসানো হয়েছে বিশাল ডিজিটাল ঘড়ি। সেখানেই চলছে কাউন্টডাউন— বিচ্ছেদের। স্বতন্ত্র ভাবে বাঁচার।

Advertisement