E-Paper

আঁচ লাগল দুবাইয়েও, এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না

দুপুর থেকে রাত অবধি সবাই নিজের মতো করে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিল। মধ্যরাতে প্রথম এল সতর্কবার্তা। সবাইকে বাড়িতে থাকার নির্দেশ।

রুমি গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০২ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫৯
দুবাইয়ের আকাশে ঝলকানি। শনিবার।

দুবাইয়ের আকাশে ঝলকানি। শনিবার। ছবি: পিটিআই।

গত কাল থেকে সারা পৃথিবীর চোখ পশ্চিম এশিয়ার দিকে। আমাদের এত দিন ধারণা ছিল, এ ধরনের সংঘাত পড়শি দেশগুলিতে হলেও দুবাইয়ে তার আঁচ লাগবে না। ভুল ভাঙল কাল দুপুরে। তখন সেটা ছিল চমক, আর মধ্যরাতে সেটাই হয়ে উঠল স্বাভাবিক।

রাত সাড়ে বারোটায় চোখ লেগে এসেছিল। দমাদম আওয়াজে ঘুম ছুটে গেল। এক দিকে, সব ক’টা মোবাইলে রেড অ্যালার্ট জারি। অন্য দিকে, আকাশে স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি আলোর ঝলকানি। সেই সঙ্গে হিম ধরানো কাঁপুনি। বাড়ির উপর দিয়ে উড়ে গেল বিমান। কিন্তু দুবাইয়ের আকাশে তো বিমান চলাচল বন্ধ। তা হলে? কিছু ক্ষণের ব্যবধানে আরও কয়েকটা বিমান চলায় বুঝলাম টহলদারি চলছে।

দুপুর থেকে রাত অবধি সবাই নিজের মতো করে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিল। মধ্যরাতে প্রথম এল সতর্কবার্তা। সবাইকে বাড়িতে থাকার নির্দেশ। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ যেন বাইরে না বেরোয়। বাড়িতেও দরজা-জানলা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ। কী করব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ভারী পর্দা টাঙিয়ে কোনও ভাবে রাত কাটানোর চেষ্টা করলাম। বাইরে তখন মিনিট দশেক কাঁপুনি ধরানো আওয়াজ। তার পরে আবার কিছু ক্ষণের বিরতি। এ ভাবেই চলতে লাগল।

শেষ রাতের দিকে চোখটা লেগে এসেছিল। ভোর সাড়ে পাঁচটায় ঘুম ভেঙে গেল আবার বিস্ফোরণের শব্দে। উঠে দেখি, আমাদের উল্টো দিকের বাড়ির মাথার পিছনে কালো ধোঁয়া। তারপর থেকে সারা সকাল আন্দাজ আধঘণ্টা পরপর আশপাশে বিস্ফোরণ হয়েই চলেছে। ততক্ষণে খবর ছড়িয়েছে, ইরানের সর্বাধিনায়ক আয়াতোল্লা আলি খামেনেই মারা গিয়েছেন। পাল্টা ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান।

এক সময়ে এমন হল যে, মিনিট দশেকের মধ্যে খান পনেরো বিস্ফোরণের আওয়াজ পেলাম। রৌদ্রোজ্জ্বল ঝকঝকে আকাশে সাদা মেঘের পুঞ্জ ভেসে উঠল। তত ক্ষণে অবশ্য দুবাই প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে যে, এর সিংহভাগই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের আওয়াজ। মানুষ যেন অযথা ভয় না পান। পরিস্থিতির উপরে নজর রাখা হয়েছে। এবং ক্রমাগত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করা হচ্ছে অত্যাধুনিক ব্যবস্থার সাহায্যে। সে সবের ধ্বংসাবশেষ থেকে বাঁচতে মানুষ যেন যতটা সম্ভব ঘরে থাকেন।

সেই আশ্বাস পাওয়ায় খানিকটা স্বস্তি মিলল। কিন্তু বিস্ফোরণের আওয়াজ পেলেই স্বভাবতই বুক কেঁপে উঠছিল। এক বার আকাশ পরিষ্কার হয়। আর এক বার কালো ধোঁয়ায় আকাশ ছেয়ে যায়। বারান্দায় বার হলেই বারুদের গন্ধ। পরে জানতে পারলাম, আমরা দক্ষিণ দুবাইয়ের যে অঞ্চলে থাকি, তার ১৫ কিলোমিটারের মধ্যেই জাবেল আলি বন্দর। আর ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে সেই বন্দর লক্ষ্য করে। দুপুর অবধি খবর, ১০০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২০০টির উপরে ড্রোন দুবাইয়ের উপরে নিক্ষেপ করা হয়েছে।

ইতিমধ্যেই খবর এল, দুবাই বিমানবন্দরের টার্মিনাল ৩-এ ক্ষেপণাস্ত্র হানা হয়েছে। দুবাইয়ের বিভিন্ন
প্রান্ত থেকে খবর আসতে লাগল, কোথায় কোথায় ক্ষেপণাস্ত্র হানা হয়েছে। পুরো দুবাই জুড়ে বিস্ফোরণ চলছে। দুবাইয়ে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষে দু’জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।

ও দিকে, আবু ধাবি কিন্তু সকাল থেকে অনেকটাই শান্ত। মধ্যরাতে আবু ধাবির ‘এতিহাদ টাওয়ার’ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হানা হয়। তা প্রতিহত করার পরে তার ধ্বংসাবশেষ থেকে এক মহিলা ও শিশু আহত হয়েছে। আমাদের যে বন্ধুরা দুবাইয়ে বেড়াতে এসে আটকে পড়েছিল, তারা সকালে আবু ধাবির হোটেলে যোগাযোগ করে জানতে পারে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক। তারা দুপুরের দিকে আবু ধাবি চলে যায়। নিরাপদে পৌঁছেও গিয়েছে। রাস্তা স্বাভাবিক ছিল বলে জানিয়েছে তারা। তবে রাতের দিকে আবু ধাবির জ়ায়েদ বন্দরে ফের ক্ষেপণাস্ত্র হানা শুরু হয়েছে বলে খবর পেয়েছি।

দুবাইয়ের জীবনও যতটা সম্ভব স্বাভাবিক। মেট্রো চলছে। রাস্তায় লোক চলাচল অন্য দিনের মতো না হলেও অব্যাহত। দর্শনীয় স্থানগুলি অবশ্য বন্ধ। প্রশাসন আগামী কয়েক দিনের জন্য স্কুল ও অফিসের কাজকর্ম ঘর থেকেই সারার বিজ্ঞপ্তি জারি করে রেখেছে। এত কিছুর মধ্যে একটাই প্রশ্ন— পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Dubai

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy