বন্দি হওয়া প্রায় ১০০ জন বিক্ষোভকারীর ‘স্বীকারোক্তি’র ভিডিয়ো প্রকাশ করল ইরান। প্রত্যেককে হাতকড়া পরানো। মুখ ঝাপসা। ইরানের সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে এমন অন্তত ৯৭টি ভিডিয়ো সম্প্রচার করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন মানবাধিকার গোষ্ঠীর আশঙ্কা, বন্দিদের উপর অত্যাচার চালিয়ে জোর করে এই স্বীকারোক্তিগুলি নেওয়া হয়েছে (যদিও সেই সব ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম)।
ইরানে গত প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে গণবিক্ষোভ চলছে। প্রাথমিক ভাবে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা-ই এখন সে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামনেইয়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের রূপ নিয়েছে। এবং তা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাড়ছে দমনপীড়ন। লাফিয়ে বাড়ছে নিহতদের সংখ্যাও। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০০০-এরও বেশি মৃত্যুর খবর মিলেছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, অন্তত ২৪০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে সে দেশে।
বিক্ষোভকারীদের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে আসছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। খামেনেই বিরোধী বিক্ষোভকারীদের সাহায্য পাঠানোর বার্তাও দিয়েছেন তিনি। ঠিক এমনই একটি সময়ে বন্দি বিক্ষোভকারীদের স্বীকারোক্তিমূলক একগুচ্ছ ভিডিয়ো প্রকাশ করল তেহরান। সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে তা নাটকীয় আবহসঙ্গীতের সঙ্গে সম্প্রচার করা হয়েছে। স্বীকারোক্তির ভিডিয়োগুলিতে মাঝেমাঝে এমন কিছু ক্লিপও জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে বিক্ষোভকারীরা ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর উপরে চড়াও হচ্ছেন।
কিছু ভিডিয়োয় প্রাণঘাতী অস্ত্রও দেখানো হয়েছে। ইরানের কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলার সময়ে ওই অস্ত্রগুলি ব্যবহার করা হয়েছিল। এ ছাড়া কিছু অস্পষ্ট ভিডিয়োয় সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর এবং তাতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। স্বীকারোক্তিগুলিতে অনেকেই আমেরিকা বা ইজ়রায়েলের কথা উল্লেখ করেছেন। তেহরানের বক্তব্য, এর থেকেই প্রমাণ হয় এই বিক্ষোভের নেপথ্যে বিদেশি ষড়যন্ত্র রয়েছে। এই অভিযোগ শুরু থেকেই করে আসছে তারা। বিক্ষোভকারীরা আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল থেকে মদত পাচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। ট্রাম্প বার বার প্রকাশ্যে বিক্ষোভে সমর্থন জানানোয়, নিজেদের দাবি আরও জোরালো করেছে তেহরান।
আরও পড়ুন:
যদিও মানবাধিকার এবং সমাজকর্মীদের দাবি, বন্দিদের উপরে অত্যাচার করে এই স্বীকারোক্তিগুলি আদায় করেছেন ইরানের কর্তৃপক্ষ। এই উদ্বেগের কারণও রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভ দমাতে কড়া পদক্ষেপ করতে দেখা গিয়েছে তেহরানে। জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে বন্দি করে অত্যাচারের অভিযোগও অতীতে বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি, অতীতে এ ভাবে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করে তা প্রচার করা হয়েছে সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে। এটি ইরানের কট্টরপন্থী প্রশাসনের একটি পুরনো কৌশল বলে মনে করছে তারা। যদিও সংবাদসংস্থা এপি রাষ্ট্রপুঞ্জে নিযুক্ত ইরানের কূটনীতিকদের কাছে এ বিষয় জানতে চাইলে তাঁরা কোনও মন্তব্য করেননি।
জাস্টিস ফর ইরান এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইট্স-এর পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১০-২০২০ সালের মধ্যে ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমে এমন ৩৫০টি ‘জোর করে আদায় করা স্বীকারোক্তি’ সম্প্রচারিত হয়েছে। টুগেদার এগেন্সট ডেথ পেনাল্টি নামে অপর এক মানবাধিকার সংগঠনের দাবি, ২০২৫ সালে এমন ৪০-৬০টি স্বীকারোক্তি প্রকাশিত হয়েছে। তবে মাত্র দু’সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ১০০ স্বীকারোক্তি ভিডিয়ো প্রকাশের ঘটনা দৃশ্যত নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন অনেকে।