E-Paper

হিন্দুদের সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে ভারতকে খোঁচা জামাতের

গত সতেরো মাসে ১১ খণ্ডে জামায়াতে ইসলামী দেশের ইতিহাসের নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে বই প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি, প্রকাশ্যেই সংখ্যালঘু হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেছে।

অগ্নি রায়

শেষ আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৭
জামাত প্রধান শফিকুর রহমান।

জামাত প্রধান শফিকুর রহমান। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

মগবাজারের সরু গলিটার নাম এলিফ্যান্ট রোড হলেও তার ভিতরে দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে একটি গাড়িই ঢুকতে পারে কোনও মতে। তা-ও অন্য দিক থেকে আসা গাড়ি বন্ধ করে। এ হেন গলির ৫০৫ নম্বর বাড়িটির দিকে এখন শুধু বাংলাদেশ নয়, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদেরও ঠায় নজর।

ষোলো বছর বন্ধ থাকার পরে চব্বিশের অগস্টে জামায়াতে ইসলামীর এই সদর দফতরের তালা খোলা হয়। এখন তা গমগম করছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অভ্যাগতদের ভিড়ে। ওই সরু গলির মধ্যে যাতে গাড়ি চলাচলে সমস্যা না হয়, তাই রাস্তায় ‘ডিউটি’ দিচ্ছেন জামাতের ক্যাডাররা।

‘‘জুলাই গণবিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা হল দুর্নীতি, বৈষম্য, নৈরাজ্য ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মানবিক বাংলাদেশ গড়া। এই নির্বাচন আমাদের খুবই আশার নির্বাচন। গত ষোলো বছরে শেখ হাসিনা যে ফ্যাসিবাদী শাসন গড়ে তুলেছিলেন, তার বিরুদ্ধে এ বারের ভোট’’, জানাচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর সহ-সাধারণ সম্পাদক আহসনাউল মাহবুব জুবের। পেশা ওকালতি, বাংলাদেশি ছাত্রশিবিরের প্রাক্তন সভাপতিও বটে। অত্যন্ত শান্ত কথা বলার ভঙ্গি, নিচু স্বরে এবং কেটে কেটে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল এই জামাত। অভিযোগ, তারা মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে সামিল হয়েছিল। আজ কী ভাবে তাঁরা ফিরে দেখছেন বাংলাদেশের একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধকে? গলা এতটুকু না কাঁপিয়েই জবাব দিলেন, ‘‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বড় অর্জন। আর সেই মুক্তিযুদ্ধের অর্জনের সঠিক বাস্তবায়নের জন্য জুলাই বিপ্লব ঘটেছে। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ডুবে গিয়েছিল দুর্নীতি আর নৈরাজ্যে। হাসিনা সরকার একাত্তরের স্পিরিটের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছেন ১৪০০ মানুষকে হত্যা করে।’’

গত সতেরো মাসে ১১ খণ্ডে জামায়াতে ইসলামী দেশের ইতিহাসের নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে বই প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি, প্রকাশ্যেই সংখ্যালঘু হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেছে। ‘‘গত ষোলো বছরে আইনশৃঙ্খলার ব্যাপক দলীয়করণ হয়েছে। পুলিশবাহিনী নিপীড়ন চালিয়েছে সাধারণ মানুষের উপর। আমরা স্পষ্ট করেই বলে দিতে চাইছি, চব্বিশের অগস্টের পর যে হিংসা ঘটেছে, তার সঙ্গে জামাতের কোনও কর্মী বা নেতা কোনও ভাবেই যুক্ত নন। ২০০৮ সালে আমাদের দলীয় সংবিধান সংশোধন করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র আনার জন্য যে কোনও ধর্মের মানুষ আমাদের সদস্য হতে পারবেন। আমরা খুলনায় ব্যবসায়ী কৃষ্ণ নন্দীকে ভোটে দাঁড় করিয়েছি। উনি অনেক দিন ধরেই আমাদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোটে মহিলাদের এবং হিন্দু ভোটও পেয়েছি এই কারণেই যে, ধর্মের ভিত্তিতে বাংলাদেশি নাগরিকের ভেদাভেদ জামাত করে না। এত দিন সুযোগ পাইনি। কিন্তু এখন মেলামেশার সুযোগ পেয়ে দেখিয়েছি, আমরা হিন্দু-বিরোধী নই।’’

জামায়েতের নায়েবে আমীর (অর্থাৎ দলের দু’নম্বর) আবদুল্লাহ তাহের ভোট প্রচারে চরকি কাটছেন দেশ জুড়ে। সেই প্রচারে সঙ্গী হয়ে কথোপকথনে সংখ্যালঘুদের পাশে থাকা, হিংস্রতার নিন্দা, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের কথাই শোনা গেল। তবে তার মধ্যেই তিনি মোদী সরকারকে রাজনৈতিক খোঁচা দিতে ছাড়লেন না। তাঁর কথায়, ‘‘দুটো বিষয় খেয়াল রাখতে হবে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে। এক, ভারত বড় প্রতিবেশী দেশ, সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখা উচিত। একটি দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সরকারের মধ্যে, জনগণের মধ্যে সুসম্পর্ক জরুরি। কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়। দুই, ভারতে সংখ্যালঘুরা যে ভাবে হেনস্থা হচ্ছেন, সেটাও ঠিক নয়। আমরা নিয়মিত ভাবে দেখছি, ভারতে কী ঘটে চলেছে।’’ জামাত সূত্রের বক্তব্য, ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতন বাড়লে বাংলাদেশেও তার প্রভাব স্বাভাবিক ভাবেই পড়তে বাধ্য। তাহেরের কথায়, ‘‘তবে সংখ্যালঘু নিপীড়নের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেই। আমরা চিন্তাগত ভাবে এর বিরুদ্ধে। যে সব হিন্দু ভারতে চলে গিয়েছেন, তাঁদের বিষয় সম্পত্তি যাঁরা ভোগ দখল করেছেন, তাঁরাই নাকি হিন্দুদের বড় মসিহা। জামাতের একটি নেতাও হিন্দু সম্পত্তি হরণ করেছে, দেখাতে পারবেন না।’’

এই দেশে এই মুহূর্তে ৪ কোটি ভোটার তরুণ। তাদের মধ্যে সত্তর ভাগ প্রথম বারের ভোটার, যারা ডিজিটাল প্রজন্ম। এই জায়গায় প্রচার এবং বয়ান তৈরির লড়াইয়ে বিএনপি-কে বেশ কিছুটা পিছনে ফেলে দিয়েছে জামাত। প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিজিটাল প্রচারে তারা অনেকটাই এগিয়ে। বিএনপি মূলত নির্ভরশীল খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেলে, জামাত মুঠোফোনে, এই দেশের নতুন প্রজন্ম যাতে চোখ এঁটে বসে থাকে অষ্টপ্রহর। অজস্র ফেসবুক পেজ, এক্স হ্যান্ডল, পোর্টাল, পেজে ছড়িয়ে রয়েছে প্রশিক্ষিত প্রচারবাহিনী।

নায়েবে আমীর জানাচ্ছেন, জিতে এলে ‘সামাজিক বিপ্লব’ ঘটানো হবে দেশে। কেমন হবে সেই সামাজিক বিপ্লব? খোলসা করতে না চেয়ে বললেন, ‘‘নৈতিক এবং জাতীয়তাবাদের সম্প্রচার হবে সমাজের সব স্তরে। সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কার করা হবে।’’

বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ মহল বলছে, রামধনুর মতো বহু রং আছে জামাতের। তার মধ্যে একটা অবশ্যই বাস্তববোধ সম্পন্ন, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, সমসাময়িক মননের সঙ্গে যার সংযোগ রয়েছে। বিএনপি ২০২৪ সালে যে অবস্থান নিয়েছে, জামাতের ওই অংশটি সেই রাজনৈতিক পরিসরটা দখল করতে চাইছে এখন। আবার দলের ভিতরেই রয়েছে কট্ট্রর ইসলামপন্থী মৌলবাদী। মুক্তিযুদ্ধে যোগ না দেওয়া এবং তাকে ডোবানোর দায় নিয়ে ভুল স্বীকার করার একটা মতামত দলের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু অন্য এক বা একাধিক অংশের প্রভাবে তা সামনে আসছে না। একটা অংশ বলছে, নির্বাচন চাই, অন্য অংশই গোপনে হিংসায় যুক্ত। একদা জামাতের সঙ্গে একত্রে ঘর করা বিএনপি নেতাদের অনেককেই তাই বলতে শুনছি, ‘‘জামাতেকে দেখে হয় আমরা বিভ্রান্ত, নয়তো ওরা নিজেরাই বিভ্রান্ত। এই জামাতেকে আমরা চিনতে পারছি না।’’

(চলবে)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

jamaat Bangladesh

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy