সংঘর্ষ ঘোষণার পরে তিন মাস অতিক্রান্ত। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান নীতি নিয়ে সংশয় অব্যাহত আমেরিকায়। পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে ধোঁয়াশায় আমেরিকার সামরিক সহযোগী এবং মিত্র দেশগুলিও। অনেকেই মনে করছেন, কখনও সামরিক অভিযান, কখনও কূটনৈতিক সমঝোতা, আবার কখনও ক্রমশ পরস্পরবিরোধী অবস্থানের মধ্যে দোদুল্যমান থাকছেন ট্রাম্প। ফলে ইরান সমস্যার স্থায়ী সমাধানসূত্র মিলছে না এখনও।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদবৃদ্ধি নিয়ে টানাপড়েনের আবহে আমেরিকার সংবাদমাধ্যম এবং আমজনতার একাংশ নতুন করে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রকাশিত কয়েকটি খবরে দাবি, সংঘর্ষবিরতির মেয়াদবৃদ্ধির বিষয়ে ওয়াশিংটন এবং তেহরান প্রাথমিক ভাবে সম্মত হয়েছে। তবে কোনও তরফেই এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে কিছু ঘোষণা করা হয়নি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স জানিয়েছেন, সংঘর্ষবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি করার বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত অনুমোদন দেননি ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কখন সেই অনুমোদন দেবেন, বা আদৌ দেবেন কি না, তা বলা শক্ত বলে জানিয়েছেন ভান্স। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিম এশিয়ায় শান্তিপ্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন:
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করেছিল পেন্টাগন। একই দিনে ইরানে হামলা চালিয়েছিল ইজ়রায়েলি বিমানবহরও। সেই অভিযানের পোশাকি নাম ছিল ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ বা ‘লায়নস রোর’। পাল্টা ইরান সেনা পশ্চিম এশিয়ায় ইজ়রায়েল এবং আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুলির বিরুদ্ধে শুরু করে ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস ৪’। ইরানের শীর্ষনেতা আয়াতোল্লা খামেনেই-সহ একাধিক প্রথম সারির সামরিক ও অসামরিক নেতার মৃত্যু হলেও নতিস্বীকার করেনি তারা। শেষপর্যন্ত ১৬ এপ্রিল সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দু’পক্ষ। এর পর দু’পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি অন্তর্বর্তিকালীন চুক্তির খসড়ায় বলা হয়, তেহরান আবার হরমুজ় প্রণালী খুলে দেবে এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শুরু হবে।
আরও পড়ুন:
কিন্তু নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, মার্কিন কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, ট্রাম্প এখনও চুক্তিটিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দেননি, এবং এ রকম আরও কয়েকটি উদ্যোগ ভেস্তে গিয়েছে। এর ফলে যুদ্ধবিরতির মেয়াদবৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় রয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ইরান যদি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ় প্রণালী না খোলে, তা হলে যুদ্ধ শুরু করার হুমকি দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প। বস্তুত, গত সপ্তাহেই হোয়াইট হাউস ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, তিনি আবার হামলা শুরু করার জন্য সামরিক বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করছেন। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে এর পরে চলতি সপ্তাহের গোড়ায় ট্রাম্প সমাজমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘‘যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা ভাল ভাবেই এগোচ্ছে।’’ কিন্তু সেই সঙ্গেই তাঁর মন্তব্য ছিল, ‘‘চমৎকার চুক্তির কম কিছু হলে আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যেতে হবে, আগের চেয়ে আরও বড় ও শক্তিশালী ভাবে — আর সেটা কেউই চায় না!”
আরও পড়ুন:
মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের (ট্রাম্পের জমানায় যার নামকরণ হয়েছে ‘যুদ্ধ দফতর’) শীর্ষস্তরের আধিকারিকেরাও ঘটনাপ্রবাহের গতিপ্রকৃতি নিয়ে বিভ্রান্ত। পেন্টাগনের কর্মকর্তা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘‘ইরান-অভিযানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ৫০ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা পশ্চিম এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকায় রয়েছেন। তাঁরা সকলেই অনিশ্চয়তা এবং দোলাচলে রয়েছেন। কারণ, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক বিকল্প থেকে আর এক বিকল্পে ঝুঁকছেন।’’
আরও পড়ুন:
জার্মানির অটো ভন বিসমার্ক থেকে আমেরিকার হেনরি কিসিঞ্জার পর্যন্ত রাষ্ট্রনেতাদের তত্ত্ব বলে, প্রতিপক্ষের সঙ্গে কূটনীতি সবচেয়ে কার্যকর হয় তখনই, যখন তার নেপথ্যে বাস্তবসম্মত পর্যালোচনা বা সম্ভাব্য সামরিক শক্তির সমর্থন থাকে। কিন্তু কূটনীতি বিশেষজ্ঞ এবং সামরিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করছেন, ইরান নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানের দোলাচল প্রায়ই এমন মনে হয়েছে যে, তা কোনও স্পষ্ট কৌশলের বদলে মেজাজ ও পরিস্থিতির প্রভাবে চালিত। ফলে বিভ্রান্তি ক্রমশ বাড়ছে, পাশাপাশি তাঁর বহু কূটনৈতিক অগ্রগতির দাবি পরে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও।