ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চিনের প্রভাব ঠেকাতে ফের তৎপর হল ভারত, আমেরিকা, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার চতুর্দেশীয় অক্ষ বা কোয়াড। মঙ্গলবার দিল্লিতে চতুর্দেশীয় জোটে বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠক শেষে সেই বার্তাই উঠে এল। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ফিজিতে যৌথ ভাবে বন্দর বানাবে কোয়াড গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলি। এই প্রথম বার কোয়াড দেশগুলি একসঙ্গে তৃতীয় কোনও দেশের বন্দরপ্রকল্পে কাজ করছে। কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে চতুর্দেশীয় জোট যৌথ উদ্যোগ ঘোষণা করতেই তার প্রতিবাদ জানিয়েছে চিন। বেজিঙের বক্তব্য, তারা কোনও ধরনের ‘এক্সক্লুসিভ ক্যাম্প’ (একচেটিয়া শিবির) গঠনের বিরোধী।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তার মাঝে এই বৈঠক কী কী বিষয় উঠে আসে, সে দিকে নজর ছিল সকলের। প্রত্যাশিত ভাবেই ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে আসে আলোচনায়। আলোচিত হয় হরমুজ় প্রণালীর প্রসঙ্গও। তবে বৈঠকের মূল নির্যাস ছিল— চিনের প্রভাব প্রতিহত করতে চতুর্দেশীয় জোটের সার্বিক প্রয়াস। দক্ষিণ চিন সাগরের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কোয়াড। একই সঙ্গে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রে নজরদারি বৃদ্ধির উপর জোর দেন মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো। তিনি বলেন, “সমুদ্রের নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে যত বাণিজ্য হয়, তার ৬০ শতাংশই হয় ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে।”
ফিজিতে চার দেশের মিলিত ভাবে বন্দর তৈরির ঘোষণাও করেন মার্কিন বিদেশসচিবই। রুবিয়োর বক্তব্য, প্রশান্ত মহাসাগরীয় এই দ্বীপটিতে বন্দরের ঘাটতি রয়েছে। সেই ঘাটতি মেটানোর জন্যই কোয়াড দেশগুলি পারস্পরিক সহযোগিতায় সেখানে বন্দর তৈরি করবে। তিনি বলেন, “ফিজির বন্দর পরিকাঠামো উন্নত করার জন্য একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা। এই প্রথম বার কোয়াড দেশগুলি কোনও বন্দর প্রকল্পে যৌথ ভাবে কাজ করবে।” উল্লেখ্য, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের এই দ্বীপরাষ্ট্রটি কোয়াডের সদস্য নয়। তার পরেও এই উদ্যোগ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। অনেকেই মনে করছেন, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চিনের প্রভাব ঠেকানোর জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঘটনাচক্রে, কয়েক দিন আগেই চিন থেকে ঘুরে গিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের সঙ্গে ‘সদর্থক’ বৈঠক করেছেন তিনি। এ অবস্থায় রুবিয়ো ফিজিতে বন্দর তৈরির ঘোষণা করায় তা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন:
কোয়াড বৈঠকের এই সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পর মুখ খুলেছে বেজিংও। কোয়াডের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে তারা। চিনা বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, “কোনও ধরনের একচেটিয়া শিবির বা জোটবদ্ধ সংঘাতের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করি না।” ফিজিতে বন্দর প্রকল্পের ঘোষণা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কোনও ধরনের উদ্যোগই এই অঞ্চলে দেশগুলির পারস্পরিক আস্থা এবং সহযোগিতার পথকে ক্ষুণ্ণ করবে না বলে আশা করি।”
পাশাপাশি রফতানি ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কোয়াড। সরাসরি কোনও দেশের নামোল্লেখ করেনি তারা। ইঙ্গিত ছিল চিনের দিকেই বলে মনে করছেন কূটনৈতিক মহলের একাংশ। কারণ, বিরল খনিজ রফতানির ক্ষেত্রে গত বছর থেকে কড়াকড়ি শুরু করেছে চিন। যার প্রভাব পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, এমনকি ভারতেও। সামরিক ক্ষেত্রেও ব্যবহার হতে পারে, এমন দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্য কোয়াড-সদস্য জাপানে রফতানির উপরেও সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে বেজিং।
মঙ্গলবারের বৈঠকে জ্বালানি উদ্বেগের বিষয়ে জোর দেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বৈঠক শেষে জয়শঙ্কর বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেন) মজবুত হওয়া দরকার।” বৈঠকে জ্বালানির পাশাপাশি সার এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বিষয়েও কথা বলেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার বিদেশমন্ত্রী পেনি ওং আবার হরমুজ় প্রণালীর পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ওই জলপথে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতার উপর জোর দেন তিনি। জাহাজ যাতায়াত করতে দেওয়ার বদলে ‘শুল্ক আদায়েরও’ বিরোধিতা করেন তিনি।