E-Paper

‘ঠাকুরভা’র রবি-বন্দনায় বিশ্বতানের জীবনগান

এ বছর রবীন্দ্রনাথের প্রাগ যাত্রার একশো বছর। তাই চেক সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ভারতীয় দূতাবাস এবং প্রাগবাসী বাঙালী সম্প্রদায়ের যৌথ ও সুচারু উদ‍্যোগে এ বারের ২৫শে বৈশাখে সাজো সাজো রব। অনুষ্ঠানসূচি দু’টি দিনে ভাগ করা হয়েছে।

শ্রেয়স সরকার

শেষ আপডেট: ১১ মে ২০২৬ ০৯:৪৫
২৫ বৈশাখ প্রাগের ঠাকুরভা স্কোয়ারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি।

২৫ বৈশাখ প্রাগের ঠাকুরভা স্কোয়ারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি। — নিজস্ব চিত্র।

‘তোমায় কিছু দেব ব'লে চায় যে আমার মন/ নাই-বা তোমার থাকল প্রয়োজন’, বলেছিলেন কবি। কিন্তু তাঁকে যে আমাদের নিত‍্যনৈমিত্তিক যাপনের পরতে পরতে প্রয়োজন। পথে-প্রবাসে, স্বজনে, সকাশে! যখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিশ্বায়ন বা দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ধারণাই গড়ে ওঠেনি ভাল করে, তখন নিবিড় অধ‍্যাবসায় বিপুল আনন্দের আসনখানি পেতেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, বিশ্বের আঙিনায়। চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগ শহরের ‘ঠাকুরভা’ রাস্তাটি রবীন্দ্রনাথেরই নামে। সেই রাস্তার ধারে ওঁরই নামাঙ্কিত স্কোয়ারে ওঁর মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম তাই।

এ বছর রবীন্দ্রনাথের প্রাগ যাত্রার একশো বছর। তাই চেক সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ভারতীয় দূতাবাস এবং প্রাগবাসী বাঙালী সম্প্রদায়ের যৌথ ও সুচারু উদ‍্যোগে এ বারের ২৫শে বৈশাখে সাজো সাজো রব। অনুষ্ঠানসূচি দু’টি দিনে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমটি ২৫ বৈশাখ, অর্থাৎ ৯ মে ঠাকুরভা প্রাঙ্গণে, দ্বিতীয়টি ১৬ মে ভারতীয় দূতাবাসের টেগোর হলে। ২৫ বৈশাখ অনুষ্ঠান শুরুর আগে আলপনা ও ফুলে সাজানো হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের মূর্তি ও পরিপার্শ্ব। মুক্ত আকাশের নীচে, রৌদ্রালোকিত দিনে অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ভারতীয় দূতাবাসের প্রথম সচিব প্রকাশ শেলট দ্বারা রবীন্দ্রনাথের মূর্তিতে মাল‍্যদানে। ‘হে চিরনূতন’ পাঠের পরে সমবেত ভাবে গাওয়া হয় রবীন্দ্রনাথেরই একান্ত জন্মদিনের গান, ‘হে নূতন’। এর পরে চালর্স বিশ্ববিদ‍্যালয়ের বাংলা ভাষার কৃতী অধ‍্যাপক মার্টিন হ্রিবেকের কথায় উঠে আসে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি চেক দেশের অপরিমেয় প্রীতির কথা। মার্টিন মনে করিয়ে দেন, রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার মনোনয়নে কতটা উৎসাহিত হয়েছিলেন তৎকালীন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা চেকরা। রবীন্দ্রনাথ যে বছর নোবেলের জন‍্য মনোনীত হন, সে বছর মনোনয়নের তালিকায় ছিলেন অস্ট্রীয় কবি পিটার রসেগার-ও। রবীন্দ্রনাথ যখন পুরস্কার পেলেন, তখন অস্ট্রীয় ঔপনিবেশিকতায় ভারাক্রান্ত চেকরা বলেছিলেন, ভাগ‍্যিস ‘আমাদের রবীন্দ্রনাথ’ নোবেল পেলেন!

অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন চেক শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পী মারেক তিলেচেক। বহু সমাদৃত চেক শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ লেওস ইয়ানাচেকের ‘পোতুলনি শীলেনেত্স (‘দ‍্য ওয়ান্ডারিং ম‍্যাডম‍্যান’) পাঠ করলেন তিনি। এই রচনাটি রবীন্দ্রনাথের ‘পরশপাথর’ কবিতার দ্বারা অনুপ্রাণিত। রবীন্দ্রনাথের ১৯২১-এর প্রাগ বক্তৃতায় ইয়ানাচেক্ মুগ্ধ হয়ে, এটি রচনা করেন। বার্নো শহরে ওঁর সমাধিতে এই রচনার দু’টি ছত্র খোদাই করা রয়েছে। অনুষ্ঠানে অংশ নেন আরও নানা শিল্পী। শ্রোতাদের মধ্যে বাঙালি ছাড়াও ছিলেন চেক-সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষ। অনুষ্ঠান শেষ হয় ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয়সঙ্গীত দিয়ে।

১৬ মে অনুষ্ঠান হবে ভারতীয় দূতাবাসের টেগোর হলে, চেক প্রজাতন্ত্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত রবিশ কুমারের উপস্থিতিতে। প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন তিনি এব‌ং সুচিন্তিত বক্তব‍্যের মাধ‍্যমে কবিকে শ্রদ্ধা জানাবেন। একটি আন্তর্জাতিক শ্রোতামণ্ডলীকে মাথায় রেখে সাজানো হয়েছে অনুষ্ঠানসূচি, ইংরেজি তর্জমাও প্রস্তুত করা হয়েছে। শিশুদের উপস্থাপনা ও ‘হৃদি-মাঝারে’ নামক নৃত‍্যনাট‍্যের পরে ‘বিশ্বযোগে রবীন্দ্রনাথ’ নামে সাংস্কৃতিক প্রযোজনা মঞ্চস্থ করা হবে, যা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিশ্বের বিখ‍্যাত কবি ও সাহিত‍্যিকের, শেক্সপিয়র থেকে জীবনানন্দ, ভাবনার সংশ্লষণকে গান, কবিতা ও নৃত‍্যে অন্বেষণ করার চেষ্টা করবে। এই প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে নিজেই সমৃদ্ধ হচ্ছি।

বাংলা থেকে এত দূরে থেকেও তাই বার বার রবীন্দ্রনাথের গান মনে যূথিমালার সুঘ্রাণ ছড়িয়ে দিচ্ছে— ‘যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি বিশ্বতানে/ মিলাব তাই জীবনগানে...।’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rabindra Jayanti Rabindranath Tagore

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy