ফাটকাবাজির মোকাবিলা করতে চটের বস্তার দাম বেঁধে দিল কেন্দ্র। পাট শিল্পের ইতিহাসে এই প্রথম। বস্ত্র মন্ত্রক নির্ধারিত নতুন দাম জানুয়ারি থেকেই চালু হবে।
কাঁচা পাট ও চটের বস্তা, দু’টির ক্ষেত্রেই ফাটকাবাজি ও মজুতদারি নিয়ে কেন্দ্র উদ্বিগ্ন। ফাটকা ঠেকাতে রাজ্য ব্যর্থ হওয়ার পরেই দাম বেঁধে দেওয়ার ব্যাপারে কেন্দ্র হস্তক্ষেপ করল।
চটের বস্তার (৬৬৫ গ্রাম এবং ৫৮০ গ্রাম বি টুইল টাইপ-এ ও টাইপ-বি) সর্বোচ্চ দাম কত হবে, সেই মর্মে গত ১৪ জানুয়ারি রাতে জুট কমিশনার সুব্রত গুপ্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করেন। কেন্দ্রীয় বস্ত্র মন্ত্রকের নির্দেশ মাফিক জারি করা ওই বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী প্রতি টন চটের বস্তার দাম ৮০ হাজার টাকা ঠিক করা হয়েছে। ফাটকা ও মজুতদারির জেরে যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৮৩ হাজার টাকা।
এ দিকে কেন্দ্রীয় সরকারের ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছে ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের চেয়ারম্যান মণীশ পোদ্দার বলেন, ‘‘দাম বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করছি। এতে পাট শিল্প লোকসানের মুখে পড়বে। সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে বেচতে গেলে ৫ থেকে ৭% লোকসান বইতে হবে। আমরা কেন্দ্রের কাছে এর প্রতিবাদ জানাব। আইনি রাস্তায় যাওয়া-সহ অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখছি।’’
কাঁচা পাট ও চটের বস্তার ক্ষেত্রে গত কয়েক মাস ধরে চূড়ান্ত ফাটকাবাজি শুরু হয়। ফলে ২০১৫-র জুলাই থেকে ২০১৬-র জানুয়ারি পর্যন্ত, এই ৬ মাসেই বস্তার দাম প্রায় ৪০% বেড়ে গিয়েছে, যার জেরে বাড়ছে বস্তায় কেন্দ্রীয় ভর্তুকি। বস্তুত গত নভেম্বর থেকেই চটের বস্তার দাম বেঁধে দিতে চেয়েছিল কেন্দ্র। কিন্তু রাজ্য সরকার এক মাস সময় চেয়েছিল। বলেছিল, তার মধ্যেই তারা মজুত কাঁচা পাট এবং চটের বস্তা বাজারে আনার ব্যবস্থা করবে। সেই মতো রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রের নেতৃত্বে কৃষিমন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসু, শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক এবং পঞ্চায়েতমন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের মন্ত্রী গোষ্ঠীও গঠন করা হয়। কিন্তু রাজ্য যে-সময় চেয়েছিল, তা ২৩ নভেম্বর শেষ হয়। অথচ কাজের কাজ কিছুই হয়নি বলেই অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মহলের। উল্টে বস্তার দাম হু হু করে বাড়তে থাকে।
রাজ্যের সঙ্গে কথা বলার আগে গত ৩ নভেম্বর মিল মালিকদের সঙ্গেও বৈঠক করেন কেন্দ্রের প্রতিনিধিরা। কিন্ত কোনও ফল মেলেনি। এর পরেই দাম বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বস্ত্র মন্ত্রক। তবে মণীশবাবুর অভিযোগ, ‘‘কাঁচা পাটের দাম বাড়ার ফলেই বস্তার দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছি। কাঁচা পাটের প্রতি টনের দাম অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই ৩০ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৭ হাজার টাকা। কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত ছিল কাঁচা পাটের দাম বেঁধে দিয়ে অবস্থার মোকাবিলা করা।’’
মণীশবাবু ওই কথা বললেও জুট কমিশনার পাট নিয়ে তাঁর বিশেষ নোটে উল্লেখ করেছেন, মজুত করার ব্যাপারে অভিযোগ যে শুধু ফোড়ে বা মিড্লম্যান এবং পাট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেই রয়েছে, তা নয়। বেশ কিছু চটকল মালিকই অভিযোগ করেছেন যে, এক শ্রেণির চটকল কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ী দাম বাড়ানোর খেলায় যুক্ত ছিলেন। অন্যতম উদ্দেশ্য, আগে মজুত করা কম দামে কেনা পাট বেশি দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি করা।
সাধারণত চটের বস্তা কেনার ক্ষেত্রে কেন্দ্র ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়। দাম প্রায় ৪০% বেড়ে যাওয়ার ফলে ভর্তুকির পরিমাণও বেড়ে যায় ৪০ শতাংশের মতো। উল্লেখ্য, চটের বস্তা এবং প্লাস্টিকের বস্তার মধ্যে দামের যে-ফারাক, সেটাই কেন্দ্রীয় সরকার ভর্তুকি হিসাবে ধরে। মিলগুলিতে যত বস্তা তৈরি হয়, তার ৮০ শতাংশই খাদ্যশস্য প্যাকেজিংয়ের জন্য কিনে নেয় কেন্দ্র।