ছোট ছোট অসংখ্য স্কুল খুলে লেখাপড়ার সুযোগকে একেবারে হাতের মুঠোয় এনে দেওয়া। যার পোশাকি নাম মাইক্রো স্কুল।
কার্যত এই মন্ত্রকে পুঁজি করেই গাঁ-গঞ্জে শিক্ষা প্রসারে ঝাঁপিয়েছে কলকাতার মাইক্রো ফিনান্স সংস্থা বন্ধন। যারা আর ক’দিন পরেই খুলবে পুরোদস্তুর বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কও।
ঠিক যে-ভাবে গ্রামে গ্রামে মাইক্রো ফিনান্স বা ক্ষুদ্র-ঋণ জোগানের ভিত গড়েছে বন্ধন, আদতে সেই পদ্ধতিতেই রূপ পাচ্ছে সংস্থার মাইক্রো-স্কুলের ভাবনাও। সেই সব স্কুলে পা রেখে দিন-মজুর, চাষি, ছুতোর মিস্ত্রির ছেলেমেয়েরা স্বপ্ন দেখছে মাথা তুলে দাঁড়ানোর।
এক দশকের বেশি ক্ষুদ্র-ঋণের কারবার চালানো বন্ধনকে সম্প্রতি ব্যাঙ্ক তৈরির অনুমতি দিয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। তা খোলার তোড়জোড় প্রায় সারা। একই সঙ্গে সমান তালে চলছে দূর-দূরান্তের গ্রামে শিক্ষা বিস্তারের কর্মযজ্ঞ। গ্রাম বাংলা জুড়ে প্রায় ৬০০টি প্রাথমিক স্কুল খুলেও ফেলেছে সংস্থা।
এখন গ্রামের মানুষেরও ধারণা বেসরকারি স্কুলে লেখাপড়া বেশি ভাল হয়, জানালেন বন্ধনের কর্ণধার চন্দ্রশেখর ঘোষ। যদিও তাঁর মতে, সরকারি হোক বা বেসরকারি, গ্রামের ছেলেমেয়েদের সামনে লেখাপড়ার সুযোগ মেলে ধরাটাই প্রাথমিক কাজ। বন্ধন কর্তার দাবি, “বহু গ্রামে স্কুল গড়তে নিখরচায় জমি দিচ্ছেন অভিভাবকেরা। অনেকে স্কুলের জন্য বাড়িও তৈরি করে দিচ্ছেন। আমাদের প্রাথমিক স্কুলে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পরে কাছের হাই স্কুলে পরীক্ষা দিয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হতে হয়। পরের শ্রেণিগুলিতেও ভাল ফল হচ্ছে।”
হাওড়ার বাগনান সংলগ্ন ভায়ের চক গ্রামে সংস্থার প্রাথমিক স্কুলে ৩১ জন খুদে পড়ুয়া। শিক্ষিকা সেলিমা বেগম জানান, “সরকারি প্রাথমিক স্কুলে অনেকেই যেতে চায় না। কিন্তু আমরা খাবার দিতে না-পারলেও, ওদের বাবা-মায়েরা এখানেই বাচ্চাদের পাঠান।” একই ছবি নাউল গ্রামে। ৩৫ জন পড়ুয়া। বাবারা কলকাতায় রংমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। অভিভাবক তোহিদুল ইসলামের কথায়, “সরকারি স্কুলে রোজ পড়া হয় না। মাস্টারমশাইদের তেমন যত্ন নেই। কিন্তু এই স্কুলে নিয়মিত লেখাপড়া হয়। নজরও খুব। হাই স্কুলে ভর্তি নিয়ে চিন্তা থাকে না।’’
চন্দ্রশেখরবাবু জানান, তাঁরা পড়ুয়াদের বই, খাতা, কলম সব দেন। নজর থাকে দক্ষ, যত্নবান শিক্ষক নিয়োগেও। তাঁদের স্কুলে পড়েই মাথা তুলে দাঁড়ানোর আশায় বুক বাঁধছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভিরা গ্রামের রিক্সাচালক, জনাব আলির মেয়ে রোকেয়া মণ্ডল বা নদিয়ার বৈকারা গ্রামের দিনমজুর, নজরুল ইসলাম ও ফাজিনা বিবির মেয়ে হালিমা। হতদরিদ্র এই সব পরিবারে কেউ কস্মিনকালেও স্কুলে যায়নি। নজরুল বলেন, গ্রামের সরকারি স্কুলে লেখাপড়া হয় না বলে বদনাম আছে। শুধু মিড ডে মিল দেয় বলে সেখানে নাম লেখানো থাকে। তবে একদিন কেউ স্কুলে না-গেলে বন্ধনের স্কুলের দিদিমণিরা বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেন বলে জানান তিনি।
অনেকের মতে, ইংরাজি পড়ানোর মান বন্ধনের স্কুলকে বেশি আকর্ষণীয় করেছে। এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন বাগনানের খরাজ মান্নার মতো অনেকে সে কথা সরাসরি বলেওছেন।
চন্দ্রশেখরবাবু অবশ্য মনে করেন, এখনও বহু কাজ বাকি। তাঁর কথায়, ‘‘গ্রামে শিক্ষা ছড়াতে বড়, ছোট— সব সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। গ্রামের মানুষ চান তাঁদের সন্তানদের যত্ন করে কেউ লেখাপড়া শেখাক। আমরা এক পা এগোলে ওঁরা দু’পা এগিয়ে আমাদের কাছে টেনে নেবেন। আমাদের অভিজ্ঞতা তেমনই বলছে।”