• নিজস্ব সংবাদদাতা
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

বোর্ডের মেয়াদ শেষ, প্রশাসক ববির হাতে কলকাতা, চ্যালেঞ্জের পথে বিজেপি

Firhad Hakim
পুরসভায় প্রশাসক বসাল রাজ্য সরকার।

আইনি জটিলতার আশঙ্কা কলকাতা পুরসভাকে ঘিরে। বোর্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় পুরসভায় প্রশাসক বসাল রাজ্য সরকার। কিন্তু, প্রশাসক বসানোর পদ্ধতি নিয়ে আইনি লড়াই ঘনিয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হল। অর্ডিন্যান্স জারি করার বদলে যে ভাবে প্রশাসনিক নির্দেশনামার ভিত্তিতে কলকাতা পুরসভায় প্রশাসক বসাল সরকার, তা সঠিক পদ্ধতি নয় বলে মনে করছে বিরোধী শিবির। ফলে আইনি পরামর্শ নেওয়া শুরু হয়েছে। বিষয়টি হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়ে যেতে পারে বলে খবর।

২০১৫-র পুর নির্বাচনের পরে কেটে গিয়েছে ৫ বছর। আগামিকাল ৭ মে অর্থাৎ বৃহস্পতিবার শেষ হয়ে যাচ্ছে পুরসভার বোর্ডের মেয়াদ। ভোটের মুখে করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকায় পুরভোট থমকে গিয়েছে। কিন্তু কারণ যা-ই হোক, ভোট যখন হয়নি, তখন এই বোর্ড আর কাজ চালাতে পারবে না। তাই বিকল্প ব্যবস্থার পথে হাঁটতে হয়েছে রাজ্য সরকারকে।

কী সেই বিকল্প ব্যবস্থা? নবান্ন সূত্রের খবর, হাওড়া, পানিহাটি বা দার্জিলিং-সহ বিভিন্ন পুরসভার মতো কলকাতা পুরসভাতেও আপাতত প্রশাসক বসিয়ে দিল রাজ্য সরকার। এত দিন যিনি মেয়র হিসাবে কাজ করলেন, সেই ফিরহাদ হাকিমকেই বোর্ড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেটরস-এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হল। এত দিন যাঁরা মেয়র পারিষদ ছিলেন, তাঁরাও থেকে গেলেন ফিরহাদের নেতৃত্বাধীন সেই বোর্ডে। যাঁর হাতে যে দফতর ছিল, তিনি নতুন ব্যবস্থাতেও সেই দফতর সামলাবেন বলে জানা যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: বাড়িতে গৃহ সহায়িকারা কি এখন আসতে পারেন? কী বলছে সরকারি নির্দেশ​

রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর বুধবার একটি নির্দেশনামা জারি করে এই প্রশাসক বোর্ড গঠন করেছে। ৮ মে অর্থাৎ শুক্রবার থেকেই এই নতুন বোর্ড কার্যভার গ্রহণ করবে বলে জানানো হয়েছে।

রাজ্য সরকারের জারি করা নির্দেশনামার ভিত্তিতে মেয়র এবং মেয়র পারিষদরা কর্মক্ষম থেকে গেলেও কাউন্সিলররা কিন্তু সকলেই এখন প্রাক্তন। যত দিন না পরবর্তী নির্বাচন হচ্ছে, তত দিন কলকাতা পুরসভার সব ওয়ার্ডই কাউন্সিলর-শূন্য অবস্থাতেই থাকতে চলেছে। কিন্তু তৃণমূল সূত্রের খবর, কাউন্সিলরদের অকেজো করে দিতে চাইছে না দল। আপাতত লকডাউন এবং সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং সংক্রান্ত নানা বিধিনিষেধের কারণে নির্বাচন হল না ঠিকই, কিন্তু কয়েক মাস পরে নির্বাচনে যেতে হতেপারে। এখন থেকে সেই সময় পর্যন্ত ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কাউন্সিলররা যদি নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকেন, তাঁদের হাতে সরকারি ভাবে কোনও কাজের ক্ষমতা যদি না থাকে, তা হলে সেটা তৃণমূলের পক্ষে রাজনৈতিক ভাবে ভাল হবে না। সেই কারণে কাউন্সিলরদেরও কর্মক্ষম রাখার বন্দোবস্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে বলে খবর।রাজ্য সরকারের নির্দেশনামায় কাউন্সিলরদের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। কিন্তু বিদায়ী মেয়র তথা প্রশাসক বোর্ডের প্রধান ফিরহাদ হাকিম সংবাদমাধ্যমকে এ দিন জানিয়েছেন যে, কাউন্সিলরদের বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বোর্ডে আলোচনার মাধ্যমে। পুরসভা সূত্রের খবর, কাউন্সিলরদের‘রিপ্রেজেন্টেটিভ অব কেএমসি’ অর্থাৎ পুরসভা নিয়োজিত প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া হতে পারে। বোর্ডের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই সেটা করা হতে পারে বলে খবর।

জটিলতা কিন্তু এই বিকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে নয়। যে পদ্ধতিতে রাজ্য সরকার কলকাতা পুরসভায় প্রশাসক বসাল, সেই পদ্ধতির জেরে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আইনজ্ঞদের একাংশের দাবি। কলকাতা পুরসভার কার্যবিধিতে সুনির্দিষ্ট ভাবে প্রশাসক বসানো সংক্রান্ত কোনও সংস্থান নেই। তাই আইনজ্ঞদের একাংশ বলছেন, অর্ডিন্যান্স জারি করে প্রশাসক বসানো উচিত ছিল। ছ’মাসের মধ্যে সেই অর্ডিন্যান্সকে বিধানসভায় পাশ করিয়ে নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ত ঠিকই, কিন্তু ছ’মাস নির্বাচন আটকে রাখার প্রয়োজনই হয়তো পড়বে না। তার আগেই হয়তো ভোট করানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যাবে, এমনও হতে পারে। আর প্রয়োজন হলে বিধানসভায় ওই অর্ডিন্যান্সকে পাশ করিয়ে তাকে আইনে পরিণত করতেও সরকারের কোনও অসুবিধা হত না।

আরও পড়ুন: কলকাতার একটি থানার ওসি এ বার করোনা আক্রান্ত​

রাজ্য সরকার কিন্তু সে পথে হাঁটেনি। প্রশাসনিক নির্দেশনামার ভিত্তিতে কলকাতা পুরসভায় প্রশাসক বসিয়েছে সরকার। অর্ডিন্যন্স জারি করতে গেলে রাজ্যপালের সই প্রয়োজন। সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রাজ্যপাল সম্প্রতি যে রকম খড়্গহস্ত হয়েছেন, তাতে ওই অর্ডিন্যান্সে রাজ্যপাল সই করতেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় ছিল বিভিন্ন শিবিরে। সেই কারণেই অর্ডিন্যান্সের পথে না হেঁটে নির্দেশনামা জারি করেছে সরকার। বলছে রাজনৈতিক শিবিরের একাংশ। কিন্তু তাতে অন্য জটিলতার সম্ভাবনা তৈরি হয়ে গেল।

কলকাতার প্রাক্তন মেয়র তথা সিপিএমের রাজ্যসভা সাংসদ বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলছেন, ‘‘রাজ্য সরকার চাইলে পুরসভার বোর্ডকে বরখাস্ত করে প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে, এমন সংস্থান আইনে রয়েছে। কিন্তু এখানে তো বোর্ডকে বরখাস্ত কর হল না। বোর্ডের মেয়াদটাই ফুরিয়ে গেল। এই পরিস্থিতিতে সরকারি নির্দেশের ভিত্তিতে প্রশাসক নিয়োগ করা সঠিক পদ্ধতি নয়।’’ অর্ডিন্যান্স জারি করা কি একমাত্র পথ ছিল? আইনজ্ঞ বিকাশরঞ্জনের মতে, ‘‘প্রশাসক নিয়োগের দরকারই ছিল না। পুর কমিশনার আপাতত পুরসভার কাজ দেখভাল করতে পারতেন। সরকার প্রয়োজন মতো পুর কমিশনারকেই নির্দেশ দিতে পারত।’’

পুরসভার কার্যবিধি এবং পুর আইন সম্পর্কে যাঁরা পুঙ্খনাপুঙ্খ ওয়াকিবহাল, তাঁরা বলছেন, যে আইন প্রয়োগ করে প্রশাসক বসানো হল, তা যথাযত নয়। তাঁদের এক জনের কথায়, ‘‘বিপর্যয় মোকাবিলা আইন এবং অন্যান্য কয়েকটি আইনের কথা সরকারি নির্দেশনামায় উল্লেখ করা হয়েছে দেখলাম। কিন্তু, কলকাতার পুরআইন বা পশ্চিমবঙ্গের পুরআইনের কোনও প্রয়োগ দেখলাম না। বিপর্যয় মোকাবিলা আইনই যদি প্রয়োগ করব, তা হলে সরাসরি বোর্ডের মেয়াদ বাড়িয়ে দেব। তা না করে, বোর্ডের মেয়াদ ফুরিয়ে গিয়েছে বলে জানিয়ে প্রশাসক বসাব কেন?’’ প্রশাসক বসাতে হলে, পুরআইনই প্রয়োগ করা জরুরি ছিল বলে তাঁর মত। সরকারি নির্দেশনামা ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলে তিনি দাবি করছেন।  

তবে কলকাতা হাইকোর্টের আর এক আইনজীবী তথা কংগ্রেস নেতা অরুণাভ ঘোষ বলছেন, যে পদ্ধতিতে প্রশাসক নিয়োগ করা হল, তাতে কোনও গলদ নেই। অরুণাভর কথায়, ‘‘সরকার চাইলে প্রশাসক বসাতেই পারে। মেয়াদ থাকাকালীন বোর্ডকে অপসারণ করে প্রশাসক বসানো যাবে, মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে ওই পদ্ধতি আর প্রয়োগ করা যাবে না, এ রকম কথা কোথাও লেখা নেই।’’ তবে অরুণাভ ঘোষ আরও বলেন, ‘‘আমার মনে হয়, রাজ্য সরকার একটা অর্ডিন্যান্স এ বিষয়ে করে নেবে অথবা মন্ত্রিসভাকে দিয়েই কলকাতা পুরসভার কাজ চালাবে।’’

আরও পড়ুন: পুলওয়ামায় ঘিরে রেখে গুলির লড়াই, নিহত শীর্ষ হিজবুল কমান্ডার রিয়াজ নাইকু​

এই আইনি তর্কের আঁচ পেয়েই সক্রিয়তা বাড়াতে শুরু করেছে বিজেপি। মঙ্গলবারই বিষয়টি নিয়ে টুইট করেছিলেন রাজ্যসভার সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত। কলকাতা এবং ৯৩টি পুরসভায় রাজ্য সরকার প্রশাসক বসিয়ে দিতে চাইছে বলে ইঙ্গিত মিলছে— লিখেছিলেন স্বপন। ২০২১ সাল থেকে যে হেতু বিরোধী আসনে চলে যেতে হবে, সে হেতু সারা জীবনের জন্য সম্পদ আহরণ করে নেওয়ার লক্ষ্যে এটা বড় পদক্ষেপ— এই রকম কটাক্ষও ছুড়েছিলেন ওই সাংসদ। বুধবার রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষও ইঙ্গিত দিলেন যে, রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করা হতে পারে।

কলকাতা পুরসভা নিয়ে রাজ্য সরকার যে সিদ্ধান্ত নিল, সে বিষয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে বিজেপি কথা বলতে শুরু করেছে বলে দিলীপ এ দিন জানিয়েছেন। সরকারি নির্দেশনামার ভিত্তিতে কলকাতা পুরসভায় যে ভাবে প্রশাসক বসানো হচ্ছে, তা ‘আইনের উল্লঙ্ঘন’ বলে দিলীপ ঘোষ এ দিন মন্তব্য করেছেন। আইনি পরামর্শ নেওয়ার পরে কোন পথে বিজেপি এগোবে, সে বিষয়ে রাজ্য বিজেপির সভাপতি বিশদে কিছু বলেননি। কিন্তু বিজেপি সূত্রের খবর, সরকারি নির্দেশকে কলকাতা হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করার কথা ভাবা হচ্ছে।

রাজ্য সরকার অবশ্য বিরোধীদের এই সমালোচনা গায়ে মাখছে না। প্রশাসক বসানোর বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলি যা বলছে, সে বিষয়ে রাজ্যের পরিষদীয় মন্ত্রী তাপস রায়ের প্রতিক্রিয়া, ‘‘বুঝে হোক বা না বুঝে, সব কিছু নিয়ে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেওয়া এঁদের যেন স্বভাব হয়ে গিয়েছে। এই সঙ্কটের মধ্যেও একপেশে মানসিকতা নিয়ে চলছেন এঁরা।’’ সরকার যে পদক্ষেপ করেছে, তাকে সম্পূর্ণ সঠিক বলে দাবি করে মন্ত্রী বলেছেন, ‘‘এই পরিস্থিতিতে মানুষের কাছে পুরসভার সব রকমের পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াটাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। সেই পরিষেবাটা বহাল রাখা কী ভাবে সম্ভব হত? প্রশাসক তো বসাতেই হত! ঘরে বসে ভাষণ দিয়ে বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া দিয়ে তো ওই কাজগুলো হয় না।’’

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন