শুধু মগজাস্ত্র নয়, শেকসপিয়র সরণিতে গাড়ি দুর্ঘটনার তদন্তে এ বার বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছে কলকাতা পুলিশ। ওই প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্ঘটনার সময় ঠিক কী ঘটেছিল তা থ্রিডি ভিডিয়োর মাধ্যমে পুনর্গঠন করবে লালবাজার।

সোমবার রাত ১০টা বেজে ১০ মিনিট। শেকসপিয়র সরণি থানা সংলগ্ন রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। কলকাতা পুলিশের পদস্থ আধিকারিক-সহ ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা তত ক্ষণে হাজির হয়ে গিয়েছেন। চার মাথার মোড়ের ঠিক মাঝখানে রাখা হল একটি থ্রি ডি লেজার স্ক্যানার মেশিন। একেবারে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে ওই এলাকা ‘স্ক্যান’ করে নিল যন্ত্রটি। আশপাশের বাড়ি, রাস্তা, দোকান, পুলিশ কিয়স্ক, এমনকি দুর্ঘটনাস্থলও। এর আগে কলকাতা পুলিশের ইতিহাসে কোনও দুর্ঘটনার থ্রি ডি লেজার স্ক্যানার দিয়ে এ ভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব করা হয়নি।

কিন্তু কী ভাবে কাজ করে থ্রি ডি লেজার স্ক্যানার? কেন এই যন্ত্রকে গুরুত্ব দিচ্ছে কলকাতা পুলিশ? বিভিন্ন দেশের পুলিশ এজেন্সি বিশেষ করে দুর্ঘটনার পর তা পুনর্গঠনের জন্য এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ট্রাইপডের উপর যন্ত্রটি বসিয়ে, দুর্ঘটনাস্থলের অতি ক্ষুদ্র বস্তুর ছবি তোলা হয়। সে জন্য ওয়াই-ফাই অথবা ইন্টারনেটের সাহায্য লাগে।

আরও পড়ুন: হাসপাতালের পাইপ বেয়ে পালাল বন্দি, ফের গ্রেফতার ব্রিজের তলা থেকে

থ্রি ডি স্ক্যানারটি ৩৬০ ডিগ্রিতে ছবি তুলতে পারে। এক সেকেন্ডে যন্ত্রটি ১০ থেকে ১ লক্ষ ছবি তুলতে পারে। ওই যন্ত্র থেকে লেজার বিচ্ছুরিত হয়ে সেখানে থাকা প্রতিটি বস্তুর উপরে পড়ে। লেজার পদ্ধতির মাধ্যেম সেই বস্তুর ছবি ওই যন্ত্রে বন্দি হয়ে যায়। পরে সেই ইমেজ থেকে থ্রি ডি গ্রাফিক ভিডিয়ো তৈরি করা হয়।

ঘরে বসেই দুর্ঘটনাস্থলের কোথায় কোন জিনিস, কত দূরে রয়েছে, কী অবস্থায় দুর্ঘটনা ঘটলে কতটা দূরে গাড়ি ছিটকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে— তা মাপজোক করা যায়। বিজ্ঞানভিত্তিক এই বিশ্লেষণের প্রভাব তদন্তেও পড়ে। কোনও অভিযুক্তের বয়ানে যদি অসঙ্গতি থাকে, সেটাও ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

কলকাতা পুলিশ জানার চেষ্টা করছে, শুক্রবার রাতে ওই এলাকায় কী অবস্থানে ছিল ঘাতক জাগুয়ারটি? কতটা গতিতে মার্সেডিজ বেন্‌জকে ধাক্কা মেরেছিল জাগুয়ার? পুলিশ কিয়স্কে ধাক্কা লাগার পর কী অবস্থায় ছিলেন দুই বাংলাদেশি নাগরিক মইনুল আলম এবং ফারহানা ইসলাম তানিয়া? এ সবই থ্রিডি স্ক্যানারের মাধ্যমে তুলে ধরা হবে। তদন্তের ক্ষেত্রে যা গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন গোয়েন্দারা। এ ছাড়াও এই তদন্তে একটি বেসরকারি সংস্থারও সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। ওই সংস্থা গাড়ি দুর্ঘটনা সংক্রান্ত বিষয়ে পুলিশের হোমিসাইড বিভাগকে সাহায্য করবে।

আরও পড়ুন: কী ভাবে দুর্ঘটনা ঘটাল আরসালানের জাগুয়ার? থ্রিডি ভিডিয়ো তৈরি করছে কলকাতা পুলিশ

এক দিকে যেমন অভিযুক্ত আরসালান পারভেজকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, তাঁর আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে, অন্য দিকে তেমনই অত্যাধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে তদন্তের কিনারাও করতে চাইছেন গোয়েন্দারা। ইতিমধ্যেই তদন্তভার নিয়েছে কলকাতা পুলিশের হোমিসাইড বিভাগ। আরসালান এখন পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। চলছে জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব। ঘাতক জাগুয়ার গাড়িটি এক বার ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করেছেন। গোয়েন্দা পুলিশের এক আধিকারিক জানান, গাড়িটি অত্যান্ত অত্যাধুনিক। ইডিআর থেকে সমস্ত তথ্যই পাওয়া যাবে। গাড়িটি কত গতিবেগে ছিল দুর্ঘটনার সময়, সিট বেল্ট বাঁধা ছিল কি না অথবা গাড়িটির কোনও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছিল কি না— এই সব তথ্য বিশ্লেষণ করলেই তদন্তের আর একটি দিক খুলে যাবে।

পুলিশ সূত্রে খবর, ইতিমধ্যেই গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাদের উপস্থিতিতেই ইডিআর সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি থ্রিডি স্ক্যানার যন্ত্রের সাহায্যে গোটা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হবে। কলকাতা পুলিশের এক আধিকারিক জানান, আদালতে এই ধরনের মামলা উঠলে অনেক সময় তদন্তকারীদের কাছ থেকে বিষয়টি সবিস্তার জানতে চান বিচারকরা। সেই সময় যদি থ্রিডি মডেল হিসাবে দুর্ঘটনার ছবি তুলে ধরা যায়, তা হলে আইনি প্রক্রিয়ায় অনেকটাই সুবিধা হয়। আবার তদন্তকারী আধিকারিক যদি বদলি হয়ে যান, তা হলে এই থ্রিডি ডকুমেন্ট সাহায্যে যিনি নতুন দায়িত্ব পাবেন তাঁর পক্ষেও তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অনেকটাই সুবিধা হবে।